• প্রচ্ছদ » » আওয়ামী লীগ যেন আবারও ‘আওয়ামী লীগ’ হয়ে ওঠে


আওয়ামী লীগ যেন আবারও ‘আওয়ামী লীগ’ হয়ে ওঠে

আমাদের নতুন সময় : 23/06/2021

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আওয়ামী লীগের বয়স বাহাত্তর পেরিয়েছে। মানুষের জীবনে এ বয়স পরিণতির, প্রতিষ্ঠানের জীবনেও তাই। কারণ মানুষ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। সুতরাং আমাদের মৌল প্রশ্নটি হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কতোটুকু পরিণত দল হয়ে উঠতে পেরেছে? মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রাচীনতম, বৃহত্তম ও তৃণমূললগ্ন একটি রাজনৈতিক দল। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। মনে রাখতে হবে, নতুন কোনো দল গড়ার লক্ষ্যে নয়, বরং বৈষম্য সৃষ্টিকারী মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনগণের মুসলিম লীগ তৈরি করার উদ্দেশ্যই ছিলো আওয়ামী লীগের। সেজন্য আওয়ামী মুসলিম লীগ শব্দটি অর্থাৎ মুসলিম লীগের আগে আওয়ামী শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিলো এবং এটা যোগ করার ক্ষেত্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর একটা ভ‚মিকা আমরা লক্ষ্য করেছি। শুরু থেকেই দেখা যায়, আওয়ামী লীগ মুসলিম শব্দটি গোড়া থেকে কেটে দিয়েছিলো।
আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি ছেটে ফেলে দিয়েছিলো। বলা যায়, তখন থেকে আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত হয়েছে। জন্মলগ্ন থেকে আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য ছিলো বাঙালির স্বার্থ উদ্ধার করা এবং স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা। বাঙালির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যা কিছু আছে, সেগুলো অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যতো আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিলো, সবগুলোতে তরুণদের ভ‚মিকা অগ্রগণ্য ছিলো ঠিকই, কিন্তু নেতৃত্বে ছিলো আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব। বিশেষ করে আমরা স্মরণ করবো অন্তত ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব অবিসংবাদিত হয়ে উঠেছিলো। একইসঙ্গে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, বঙ্গবন্ধু সরকারি মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব অবহেলা করে এবং অনেক সময় সরকারি পদ প্রত্যাখ্যান করে দলের কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। যেমন ১৯৫৭ সালে তিনি প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী কিন্তু মন্ত্রী এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে পারছিলেন না বলেই মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। একই কাজ তিনি ১৯৭৪ সালেও করেছিলেন। আওয়ামী লীগের দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং তার আরও একটি লক্ষ্যণীয় দিক যেটি আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে, সেটি হচ্ছে আওয়ামী লীগকে বাঙালির নেতৃত্বে পরিচালনা উপযোগী দলে পরিণত করতে পেরেছিলেন, সেটি হচ্ছে তার দলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতৃত্ব তৈরি করতে পেরেছিলেন। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি সত্তে¡ও তার তৈরি করা চার নেতা, যাদের আমরা জাতীয় নেতা বলে থাকি, তারা মুক্তিযুদ্ধকে সফল পরিসমাপ্তি দিতে পেরেছিলেন। এটি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব গড়ার একটি বড় অবদান। আওয়ামী লীগের মাধ্যমে বাঙালি পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। তারপরে বাহাত্তরে বাঙালির যাত্রা শুরুটাও হয়েছিলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। বাংলাদেশের যে সংবিধান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রণীত হয়েছিলো বাহাত্তরে, সে সংবিধানটি তৃতীয় দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। বাঙালি রাষ্ট্রের আদর্শিক চরিত্র কী হবে তা নির্দেশ করা হয়েছিলো ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে। তারপরে পঁচাত্তরে আওয়ামী লীগের শনিরদশা শুরু হয়। কারণ বাংলাদেশের সামরিক শাসন। তৈরি হলো বিএনপি নামের এক উদ্ভট রাজনৈতিক দল। সামরিক সেনা ছাউনিতে কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক দলের জন্ম হতে পারে না। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরে যিনি ক্ষমতাসীন ছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, তিনি ক্ষমতায় আসীন হলেন এবং জাতীয় পার্টি তৈরি করলেন। যেটি বিএনপির মতোই সেনা ছাউনিতে তৈরি একটি দল।
ধর্মের ভিত্তিতে কোনো দল তৈরি হতে পারে না। ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার, রাজনৈতিক নয়। ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশে তৈরি করা হয়েছে পঁচাত্তরের পর থেকে। আওয়ামী লীগ তখন অস্তিত্বের সংকটে ছিলো। আবার ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ বড় রকম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিলো, সেই সময় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নির্বাসিত শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরেছিলেন। ফিরে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন জনগণকে ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন। তারপরে তো বুড়িগঙ্গায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে, শেখ হাসিনা প্রায় চার দশকের মতো নেতৃত্বে এবং পরপর তিনবার ক্ষমতায় অছেন। এই সময় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্জন প্রচুর, কিন্তু ব্যাষ্টিক অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ। আজকে আওয়ামী লীগ এমন একটি দল, যার কাছে বাঙালি জাতি নানান কারণে ঋণী। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগের সামনে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় আছে।
করণীয়র মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑ দলটির যে আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটে গেছে, সেটির রাশ টেনে ধরা। তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভালাভের উদ্দেশে আদর্শের জায়গায় আপোস করা আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে দুর্বল করেছে। এ ব্যাপারে কিছু করণীয় আছে বলে আমার মনে হয়। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এবং দল একাকার হয়ে গেছে। যা বঙ্গবন্ধুর আমলে ছিলো না। সরকার এবং দল একাকার হওয়া অগণতান্ত্রিক। এই জায়গাটিতে আওয়মী লীগের করণীয় কিছু আছে। বঙ্গবন্ধু যে ধরনের নেতৃত্ব তৈরি করেছিলেন, না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেননি। যদি কোনো কারণে শেখ হাসিনা অপারগ হন, তাহলে আওয়মী লীগের হাল কে ধরবে?
ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার জন্য আওয়মী লীগের যে নরম নীতি, সেটি পরিহার করা দরকার। কারণ এখানে আদর্শিক বিচ্যুতি বড় হয়ে যায় এবং হেফাজতের নির্দেশে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আমরা পছন্দ করিনি। এটা বর্জন করতে হবে। সব মিলিয়ে আমি বলবোÑ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কার্যকর দল। সেই দলকে এখন দেশের জন্য অনেক কিছু দেওয়ার আছে, তাদের আরও দিতে হবে। আরেকটা বড় রকমের ক্ষতি হচ্ছে শাসন ব্যবস্থা। শাসন ব্যবস্থায় শৈথিল্যের কারণে সারা দেশের সমাজব্যবস্থা অস্থির ও অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে জাতি। এগুলো সামাল দিতে হবে আওয়ামী লীগকেই। আমার শেষ কথা হলো, আওয়ামী লীগ যেন আবারও ‘আওয়ামী লীগ’ হয়ে উঠে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই আমার প্রত্যাশা। পরিচিতি : ইতিহাসবিদ। অনুলিখন : তানিমা শিউলি।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]