• প্রচ্ছদ » » ১৯৭৭ থেকে ২০২১, গার্মেন্টস সেক্টর দেশকে অনেক দিয়েছে কিন্তু নিজেকে স্বনির্ভর করে তুলতে পারেনি


১৯৭৭ থেকে ২০২১, গার্মেন্টস সেক্টর দেশকে অনেক দিয়েছে কিন্তু নিজেকে স্বনির্ভর করে তুলতে পারেনি

আমাদের নতুন সময় : 02/08/2021

সালেহ বিপ্লব : ১. দেশ গার্মেন্টস দিয়ে শুরু। সেই দিনগুলো আমার মনে আছে। ২. চোখের সামনে চট্টগ্রামে গার্মেন্টস শিল্পটা গড়ে উঠতে দেখলাম। মালিকদের দেখেছি, চিনেছি। শ্রমিকদেরও খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি। গার্মেন্টসের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের বেড়ে ওঠা দেখেছি। পেশাগত জীবনে এসে এই সেক্টরের সাথে অনেক বছর কাজ করেছি, বেশ নিবিড় একটা সম্পর্ক অনুভব করি গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল সেক্টরের সঙ্গে।
৩. গার্মেন্টস শিল্পে শুরু থেকেই দেখেছি, প্রতিটি কারখানায় কতোগুলো কালো হাত আছে। এই হাতগুলো আবার মালিকের হাত হিসেবেও কাজ করে। তারা শ্রমিকদের নির্যাতন করে। মেয়েদের সর্বনাশ করে। চুরি করে। ইপিজেডের গার্মেন্টসগুলো গুণেমানে অনেক উঁচুদরের হলেও সেখানেও কিছু প্রতিষ্ঠানে এই দুষ্টুদের হাত পুরো না থাক, একটা আঙ্গুল অন্তত থাকে। ৪. দেশ গার্মেন্টস দিয়ে শুরু, কয়েক বছর লাগলো আরো কারখানা গড়ে উঠতে। তখন গার্মেন্টসে কাজ করা ছিলো ভয়াবহ ব্যাপার। অ ও অর্ধশিক্ষিতরা তো বটেই, উচ্চশিক্ষিত মানুষও গার্মেন্টসে চাকরির বিষয়টা কেনো জানি মানতে পারতেন না। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তো মানতেনই না। কিন্তু এই সেক্টরের প্রধান চালিকাশক্তি নারী। ৫. সেই সময়ও কিন্তু মেয়েরা পরিবার ও সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে এই সেক্টরে শুধু শ্রমিক নয়, অফিসার পদেও চাকরি করেছে। পরে কেউ কেউ উদ্যোক্তা হয়েছেন। ৬. আমার পরিচিত ও বন্ধুদের অনেকেই এই সেক্টরের বিভিন্ন লেভেলে আছেন। আমি আজ বলবো একজন সাধারণ শ্রমিকের গল্প। ৭. মেয়েটা এসেছিলো বরিশাল থেকে। ৩০০ টাকায় জয়েন করলো চাকরিতে। হেলপার পদে, এই পদে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াও কাজ মিলে। কারখানা দেওয়ানহাট, বাসাও নিয়েছে কাছাকাছি। একটা কলোনীতে টিনের ঘরে কয়েকজন মিলে থাকে। সিট ভাড়া ১০০ টাকা।
৮. মেয়েটি ফজরের আজান হলে ঘুম থেকে ওঠে। চট করে আধা পট (আধা পোয়া) চাল ধুয়ে চুলোয় বসিয়ে দেয়। সাথে তিনটা আলু। নামাজ পড়ে এসে একটা পেঁয়াজ আর দুটো কাঁচামরিচ কাটতে কাটতে ভাত হয়ে যায়। একটা আলু ভর্তা করে ভাত খায়। আর দুটো আলু একটা বক্সে নিয়ে নেয়, সেটা দুপুরের খাবার।
৯. দেওয়ানহাটের গার্মেন্টসে পৌঁছতে বারো থেকে পনেরো মিনিট সময় লাগে। কাজ শেষে সন্ধ্যায় দলবেঁধে ফিরে আসা। ভাতের সাথে একটা কিছু রান্না করে রাতের খাবার। তারপর ক্লান্ত দেহটা আর পারে না। শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘুম। ওভারটাইম থাকলে দেরি হয়। সেদিন আবার রাতের রান্নার ঝামেলা থাকে না, অফিসেই খাওয়া হয়।
১০. ৩০০ টাকা বেতনে চাকরি করা মেয়েটা শুরুতে ১০০ টাকা করে বাড়িতে পাঠাতো। ৬ মাসের মাথায় তার বেতন হলো ৫০০ টাকা। এভাবে দিনে দিনে দক্ষ শ্রমিক হয়ে উঠলো, পদ বাড়লো, বেতনও। ছোট বোনকে নিয়ে এলো গ্রাম থেকে। দেওয়ানহাটে তখন শ্রমিকদের কাজ শেখানোর অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেখান কাজ শিখিয়ে ভালো একটা চাকরি দিলো বোনকে। দুবোনের মিলিত প্রচেষ্টায় বরিশালের এক নিভৃত পল্লীর দরিদ্র পরিবারটির স্বচ্ছল হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
১১. আনিস ভাই (আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন) একবার একটা পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিলেন। গার্মেন্টস হওয়াতে লিপস্টিক, চুড়ি, স্নো এবং এ জাতীয় অন্যান্য সামগ্রীর বিক্রি কতো পারসেন্ট বেড়েছে, সেই হিসেব দেখিয়েছিলেন তিনি। আমি খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম, বিষয়টা এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে। ১২. এখানেই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা, বিশেষত নারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও আত্মপরিচয়ে বলীয়ান করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প অসামান্য ভ‚মিকা রেখেছে।
১৩. কিন্তু গার্মেন্টস মালিকদের অনেকেই যে কাজটা করেননি, তা হলো ক্যাপাসিটি বিল্ডিং। তারা যেটা করেননি, সেটা হলো রি-ফিন্যান্সিং। গার্মেন্টস মালিকদের মধ্যে স্বপ্নবান বিনিয়োগকারীর সংখ্যা খুব কম। তাই এটা হয়েছে। ১৪. যতোদ্রæত সম্ভব শহরের বাইরে নিজস্ব ভবনে গার্মেন্টস চালু করবো, এই ইচ্ছেটা কতো পারসেন্ট গার্মেন্টস মালিকের আছে, জানতে ইচ্ছে করে। ১৫. নিজস্ব ভবনের পাশাপাশি নিজস্ব কমপ্লেক্স তৈরি করবো। সেই কমপ্লেক্সে আমার স্থায়ী কর্মীদের কোয়ার্টার বানাবো। ব্যাচেলরদের ডরমিটরি বানাবো। এই চিন্তা করেছেন, এমন গার্মেন্টস মালিক কতোজন আছেন? প্রায় ৪০ বছর পার হয়ে গেলো এমন একটা গার্মেন্টস কেনো হলো না, যেখানে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এক ক্যাম্পাসে থাকেন?
১৬. কোনো কারণে বিল পেলে দেরি হলে অন্তত এক বছর প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্যাপাসিটি কয়জন মালিকের আছে? অন্তত তিন মাস শ্রমিকদের খাওয়াতে-পরাতে পারবেন, এমন ক্যাপাসিটি কি কোনো গার্মেন্টস মালিকের নেই? বছরের পর বছর টাকাগুলো কী করেছেন? গার্মেন্টস কারখানা থেকে আসা আয়ের কতোটা অংশ ওই কারখানার উন্নয়নে ব্যয় করেছেন? এসব প্রশ্নের জবাব বেশির ভাগ মালিকই দিতে পারবেন না।
১৭. আগস্টের ১ তারিখ গার্মেন্টস খোলা। খবর পাওয়া মাত্রই ঊর্ধ্বশ্বাসে শহরমুখী হচ্ছে গ্রামে চলে যাওয়া শ্রমিকরা। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, পরোয়াই করছেন না। বিজিএমইএ সভাপতিকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি বলেছেন, ১ তারিখ আসতে না পারলেও কারো চাকরি যাবে না। বলাই বাহুল্য, করোনার কারণে অনেক শ্রমিক শহরের বাসা ছেড়ে গ্রামে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
১৮. গার্মেন্টস কারখানা কী কারণে এখনো ফ্লোটিং ওয়ার্কার দিয়ে কাজ করায়? বেশি বেতন পেলে কর্মীরা কাজ ছাড়বে, এটা স্বাভাবিক, কিন্তু তার সংখ্যা খুব বেশি হওয়ার কথা না। গার্মেন্টস কারখানা কেনো পারছে না নিজস্ব জনবলকে স্থায়ী করতে? ২২ লাখ (ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড মিলে ৪০ লাখ) কর্মী আর ৩ হাজার মালিক কেনো একটা পরিবার হয়ে উঠতে পারছেন না? ১৯. মিশু আপা অত্যন্ত যোগ্য একজন নেতা, কিন্তু গার্মেন্টস সেক্টরে দাগ কাটার মতো কিছু করতে পেরেছেন? নাজমা আপা, সেই কবে থেকে আপনাকে দেখছি। আপনি অনেক বড়ো নেতা হয়েছেন, আপনার যোগ্যতা ও ভূমিকা প্রশংসনীয়। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নের বেসিক জায়গাটাই তৈরি করতে পারলেন না এখনো। কেনো?
২০. বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নুরুল কাদের (আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন) বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের ভ্যানগার্ড। তিনি শুরু করার পর ধীরে ধীরে এগিয়েছে এই সেক্টর, প্রথম দিকে শিল্পের চেয়ে সার্ভিস সেক্টরের ক্যারাক্টারটাই প্রধান ছিলো। একটা সময়ে এসে আমরা ভ্যালু এডিশন করতে সক্ষম হলাম। এটা ছিলো আরএমজি সেক্টরে আর একটা বৈপ্লবিক অধ্যায়। ২১. এখন দরকার ভিশনারি এন্টারপ্রেনিউরশিপ। আনিস ভাই স্বপ্নবান মানুষ ছিলেন, স্বপ্নের বাস্তবায়ন ছিলো তার নেশা। তিনি আমাদের আরএমজি সেক্টরে বিশাল অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু আনিসুল হকের মতো সৃজনশীল নেতা বার বার আসেন না। আর শুধু নেতার ভিশন দিয়ে চলা যায় না। নেতার ভিশনকে আত্মস্থ করতে না পারলে সামগ্রিক উন্নয়ন হয় না, হবেও না। ২২. করোনা মহামারী এ টু জেড, সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে কার ব্যক্তিগত সক্ষমতা কতোটুকু। ২৩. এই মহামারীকালে আর সবার মতো আরএমজি মালিকদেরও ভাবতে হবে, কী করে এ ধরনের বিপর্যয় সামলাবেন। স্পেসিফিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে। গার্মেন্টস খাত থেকে আসা টাকা দিয়ে শুধু নিজের বাড়ি-গাড়ি-ব্যালান্স গড়বেন নাকি দেশ, কারখানা ও শ্রমিকের হক পুরোটা আদায় করবেন, সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]