• প্রচ্ছদ » » মরমী কণ্ঠ দরদী শিল্পী ছিলেন বাউল সম্রাট আবদুল করিম


মরমী কণ্ঠ দরদী শিল্পী ছিলেন বাউল সম্রাট আবদুল করিম

আমাদের নতুন সময় : 12/09/2021

দীপক চৌধুরী : এগারো বছর আগে এই দিনে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম আমাদের ছেড়ে চলে যান দুনিয়া থেকে। তাঁর রচনা, গান এবং দর্শন আমাদের সংস্কৃতিতে মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এতো জনপ্রিয় বাউল দ্বিতীয় কেউ আছে কি না আমরা জানি না। তাঁর গান, দৃষ্টিভঙ্গী ও চেতনা এতোটাই ব্যতিক্রম যে, সব জায়গায় সবরকম সবগুণের অধিকারী ছিলেন শাহ আবদুল করিম। বাউল আবদুল করিম সবসময় তাঁর রচনাগুলোকে বাউল গান বলে উল্লেখ করতেন। তিনি তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে বাউল দর্শনের শিকড় অনুসন্ধান করেছিলেন, অনেকটা হাসন রাজা, রাধারমন দত্ত, উকিল মুন্সী, দুর্বীন শাহ এবং আরও অনেকের মতো। তবে তাঁর রচনার মধ্যে বিচিত্রতা ছিলো। তিনি মুর্শীদি, ভাটি বাংলা, লোকগান, জাগরণী, মরমী, ধামাইল গীত, সারিগানসহ অসংখ্য গান রচনা করেন। বিভিন্ন সুরে গাওয়া যায় এমন গানও রয়েছে। এ কারণেই অনেকে আবার তাঁকে চারণকবিও বলে থাকেন। বাংলাদেশে অবস্থানকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমি তাঁর গানগুলো ভাষান্তর করতে চাই।’ বাউল করিমের গান শুনে তিনি ভীষণ মুগ্ধ হন। কারণ, আমরা জানি লোককাব্যের প্রধান আকর্ষণ সহজ কথা।
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের উজানধলে জন্মগ্রহণকারী শাহ আবদুল করিম সংগীতপিপাসু মানুষ হলেও তিনি বেড়ে ওঠেন অতিকষ্টে, সাধারণ পরিবারে। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা, তিনি স্কুলে পড়েননি এবং খুব ছোটবেলা থেকেই তার আবেগকে সংগীতভাবে প্রকাশ করতে শুরু করেন বলেই রচনাগুলো হয়ে ওঠে জীবনভিত্তিক। প্রাণের সঞ্চার ঘটে তাঁর রচনায়। আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে আবদুল করিমের চিন্তা ও শব্দমালা। তিনি গণসঙ্গীত (জনসাধারণের গান) ও লিখেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি পুঁজিবাদী সমাজে মানবজাতির যন্ত্রণা সম্পর্কে তার অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। শাহ আবদুল করিমের রচনাগুলো আধ্যাত্মিকতার গভীর চিন্তা প্রদর্শন করে। তিনি বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বক্সের তত্ত্বাবধানে সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার জ্ঞান অর্জন করেন। তার স্ত্রীর নাম ছিলো আফতাবুন্নেসা। কিন্তু বাউল করিম তাঁকে সরলা নামেই সম্বোধন করতেন। ফলে লোকমুখে সরলা নামটিই বেশি প্রচারিত হয়েছিলো। এবং এটাও সত্যি যে, সরলা তাঁর সঙ্গীতকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। পরিবেশ এবং গ্রামের মানুষ তাঁর জীবনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলো। এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘পীরসাহেব’ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। কারণ সাধারণ বিপদগ্রস্ত মানুষের বিশ^াসের ভরসাস্থল ছিলেন তিনি। তিক্ত নানা অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে রাখতে ভালোবাসি আমরা কিন্তু তিনি অতীতের তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতাও গানের মধ্যে সুন্দরভাবে প্রবেশ করিয়েছেন। গানের কথায় ও সৌন্দর্যে সুরের আকর্ষণ সমৃদ্ধ হয়েছে। ইতিহাস থেকে আমরা অনেকেই জানি, সব আন্দোলন, যুদ্ধ ও দ্রোহে তিনি ছিলেন সংযুক্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু গানের মধ্যে রয়েছে ‘মুর্শিদ ধনো হে কেমোনে চিনিবো তোমারে;’ ‘নাও বানাইলো বানাইলো রে কোন মেস্তোরি; ‘আসি বলে গেলো বন্ধু; ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’;, ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো; ‘ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও; ‘গাড়ি চলে না; ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। সুদীর্ঘ ছয়দশকব্যাপী শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনায় বাউলগানসহ সকল সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি প্রায় ২০০০ গান লিখেছেন এবং সুর করেছেন। সবকটি গান বইয়ে সংকলিত হয়নি। তবে প্রায় ছয়টি বইয়ে সংকলিত হয়েছে অনেক গান। এই বইগুলো হল আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮), গণসঙ্গীত (১৯৫৭), কালনির ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮) এবং কালনির কূলে (২০০১)। তাঁর একমাত্র ছেলে শাহ নূরজালাল (বাবুল) একজন জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার। কয়েকটি বাউল গ্রন্থের রচয়িতা। তিনিও গান করে থাকেন। বাউল করিমের ভাগিনা শাহ আবদুল তোয়াহেদ গান রচনা করে থাকেন। ঢাকার বাংলাবাজারের ‘মম প্রকাশ’ থেকে ‘কালনীর স্রোতে’ নামে শাহ তোয়াহেদের একটি বাউলগান সমৃদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে শাহ আবদুল করিম একুশে পদক লাভ করেন। গণজাগরণের শিল্পী শাহ করিমের গান নামী-দামী বড় শহরের পাশাপাশি মেলায়-উৎসবে, বাস-টার্মিনালে, লোকসমাগমের সকল স্তরে এমনকি গ্রামের দোকানে অহরহ শোনা যায়। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য বাউলগান অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সম্ভবত শাহ করিমের রচনায় শব্দচয়নের সৌন্দর্যে। তাঁকে অন্তর থেকে নিবেদন করি শ্রদ্ধাঞ্জলী। লেখক: উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি ও কথাসাহিত্যিক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]