সেদিনের কথা

আমাদের নতুন সময় : 12/09/2021

সেলিম জাহান : ভীষণ সুন্দর দিন ছিলো সকালটি- ২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বরের সকাল। প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বরে আমার কৈশোরের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় স্কুল বন্ধ থাকতো সেদিন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিরোধান দিবস সেটি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকালেও শৈশব-কৈশোরের সে কথাটি ভুলিনি। কিন্তু দু’দশকের আগের সে সকালটি আমাকে মুগ্ধ করেছিলো অন্য কারনে। মেঘমুক্ত কী ঘন নীল অম্বর, উজ্জ্বল হেমন্তের ঝক ঝকে রোদ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। একটু হালকা মৃদুমন্দ বাতাস। কর্মদিবস সেটি-সুতরাং গা এলিয়ে ঘরে বসে প্রকৃতির এ শোভা উপভোগের সময় নেই। তৈরি হচ্ছিলাম কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য। প্রাত:রাশের সময়ে বেনু আমাকে জানালো যে, কিছুক্ষণ আগে একটি বিমান ঞরিহ ঞড়বিৎ এ আঘাত করেছে। কিছুক্ষণ আগে টেলিভিশনের খবরে জেনেছে সে। কিন্তু তা নিয়ে সংবাদ ভাষ্যকারের কেন উত্তেজনা ছিলো না। কারণ, ধারণা করা হচ্ছিলো, ওটা খুব সম্ভবত: কোনো ছোট প্রশিক্ষণ বিমান। সকালের দিকে নিউইয়র্কের আকাশে বেশকিছু প্রশিক্ষণ বিমান বেরোয় – বেশির ভাগই ম্যানহ্যাটনের নিচের দিকে। সে সবেরই একটা হবে হয়তো। সুতরাং বেশ নিরুদ্বেগ চিত্তে মৃদু গল্প করতে করতে আমরা প্রাত:রাশ সারছিলাম পূর্বী নদীমুখী আমাদের বারান্দায়। টেলিভিশনটি আমাদের শোবার ঘরে। সেটা চলছে বাটে, কিন্তু সেটার কান মুচড়ে শহদ বন্ধ তরে দেওয়া হয়েছে বল, কিছুই শোনা যাচ্ছিলো না। সুতরাং যা হয় নিত্যদিন, তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলাম। দ্বীপের লাল বাসেই উঠে বুঝলাম, কিছু একটা হয়েছে। উত্তেজিত আলোচনা বেশ সরব গলায়। যেটুকু বুঝলাম, তাতে বোঝা গেল যে, ছোট প্রশিক্ষণ বিমান নয়, বড় যাত্রীবাহী বিমানই আঘাত করেছে ঞরিহ ঞড়বিৎ এ। অনেকেই বললেন যে, ম্যানহ্যাটনের নিচ দিক দিয়েই বহু বিমান ঔঋক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। কিন্তু যেহেতু ঋরহধহপরধষ উরংঃৎরপঃ এ সুউচ্চ হর্ম্যরাজি আছে, সুতরাং ঞরিহ ঞড়বিৎ এ কোনো বিমান হয়তো ভুল করে আঘাত করেছে। বলে নেওয়া ভালো যে, তখন পর্যন্ত লালবাসের সহযাত্রীরা এ ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছিলেন এবং সন্ত্রাসের কোনো সম্ভাবনাই তাদের ভাবনায় ছিলো না।
ঘটনা প্রবাহের সংবাদ বদলাচ্ছিলো বড় দ্রুত। পূর্বীনদীর পারাপারের দুলুনীবগীতে উঠেই আসল ঘটনার কথা জানা গেল। নদীর মাঝামাঝি এসে তাকিয়ে দেখা গেল যে, ঞরিহ ঞড়বিৎ এর একটি স্তম্ভ থেকে ঘন ধোঁয়ার কুন্ডুলী বেরুচ্ছে। বগীর সবাই মুঠোফোনে তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলো, কেউ কেউ পারছিলো, কারও কারও ফোন যাচ্ছিলো না। আমার একটা ফোন এলো – বেনুর। ওর কণ্ঠস্বর শুনলাম ‘বাড়ি ফিরে এসো’। তারপরই সংযোগ কেটে গেল। ম্যানহ্যাটানে পৌঁছুলাম। চারদিকের জনজীবনে খুব যে একটা চিড় ধরেছে, তা মনে হলো না। হয়তো তখনও ঘটনার ভয়াবহতা সবার জানা হয়নি। অন্য সবার মতোই সামনে এগুলাম। জাতিসংঘ ভবনের সামনে পৌঁছুতেই দেখা পেলাম নানান সহকর্মীদের-বেশ একটা জটলা সেখানে। নিরাপত্তা প্রহরীরা কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিলো না। ততোক্ষণে ঞরিহ ঞড়বিৎ এর দ্বিতীয় স্তম্ভও আক্রান্ত হয়েছে। চবহহংুষাধহরধ’র খবর আসলো। গুজব শোনা গেল যে, জাতিসংঘ ভবনেও হামলা হতে পারে। নিরাপত্তা কর্মীরা আমাদের ৪৯ নং সড়কের দিকে সরে যেতে বললেন। মন ঠিক করে ফেললাম যে, বাড়ি ফিরে যাবো। বেনুকে ফোন করলাম। যাচ্ছে না – সব ফোন লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখি লোকের ঢল নেমেছে রাস্তায়। ভাবলাম, পাতাল রেলে বাড়ি ফিরি। দেখা গেল, বাস, রেলপথ সব বন্ধ করে দেয় হয়েছে। বড় কন্যা তখন পড়ছে ক্যানাডার হ্যালিফ্যাক্সে সেন্ট মেরী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছোট কন্যা বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক লহমার তরে দু’জনকেই পাওয়া গেল। জানালাম, ঠিক আছি আমরা। রাস্তায় উর্ধশ্বাসে লোক ছুটছে। ছঁববহং ইড়ৎড়ঁময সেতুতে মানুষের ঢল নেমেছে। সবাই হেঁটে বাড়ি ফিরছে। রাস্তায় হলুদ ট্যাক্সিগুলো সাঁই সাঁই করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউই তাকাচ্ছে না এ’দিক ও’দিক। সবাই যেন পাগলের মতো প্রান বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যেই বিদ্যুতও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাত তুলছি যদি কোনো হলুদ ট্যাক্সিযায়। কেউ সাড়া দিচ্ছে না। যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, হেঁটেই পথ পাড়ি দেবো, তখনই ঘ্যাঁস করে আমার পাশে একটি হলুদ ট্যাক্সি থামলো – জানালা দিয়ে চালক পরিস্কার বাংলায় বললেন, ‘কোথায় যাবেন?’ দ্বীপের নাম বলতেই বললেন, ‘দ্বীপের ভেতরে যেতে পারবো না। সেতুর মুখে নামিয়ে দেবো। নিতাম না কোনো সওয়ারী। আপনাকে দেখে বাঙালি মনে হলো, তাই আপনাকে তুললাম।’ আমি যেন হাতে চাঁদ হাতে পেলাম। সেতু মুখ থেকে আাদের আবাস মাত্র ১০ মিনিটের পথ। আমি ট্যাক্সিতে উঠে আসলে হেলান দিযে চোখ বন্ধ করলাম। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। লেখক : অর্থনীতিবিদ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]