• প্রচ্ছদ » » বই আমার কাছে শিল্পকর্মের মতো


বই আমার কাছে শিল্পকর্মের মতো

আমাদের নতুন সময় : 13/09/2021

রফি হক : ‘বই নিজেও একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মূল্যবান বা দুষ্প্রাপ্য বই মালিকানা বদলায়। এক সংগ্রাহক থেকে অন্য সংগ্রাহকের ভাঁড়ারে গিয়ে ওঠে। পাঠক কখনও বইয়ের মার্জিনে লিখে রাখেন তাঁর নিজস্ব টিকা-ভাষ্য। তখন সেই বই তার দুই মলাটের ভিতর ধরে রাখা বিষয়কে ছাপিয়ে অনেক দূরের দিগন্ত দেখতে পায়’। -শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। বই আমার কাছে শিল্পকর্মের মতো। প্রতিটি পছন্দের বই আমার কাছে পছন্দের শিল্পকর্ম। আমার এইটুকুন জীবনে কেবল দুটি জিনিস সংগ্রহ করেছি- [১] বই, [২] পেইন্টিংস। অনেক বড়ো পেইন্টিং নয়। ছোট ছোট। যে সমস্ত শিল্পকর্মের সঙ্গে আমি সংযোগ স্থাপন করতে পারি, সম্পর্ক তৈরি করতে পারি, তার ভিতরে ঢুকতে পারি, কথা বলতে পারি, ভালোবাসতে পারি ‘সেই সমস্ত ড্রইংস, পেইন্টিংস আমি কালেকশন করেছি এবং আমার সামর্থের ভেতর যা কিনতে পেরেছি। আমি একজন শিল্পী হয়েও, অন্য অনেক খ্যাতিমান শিল্পীদের স্নেহভাজন হয়েও আজ পর্যন্ত কোনো শিল্পীর ছবি বিনে পয়সায় নিইনি, উপহার দিলেও নিইনি। অনেক সময় সামান্য কিস্তিতে কিস্তিতে কিনেছি। দুই হাজার, তিন হাজার টাকা কিস্তি দিয়েও কিনেছি। একবারে কুড়ি হাজার টাকা কিস্তিতে শুধু আমার সহপাঠী বন্ধুর ওয়াটার কালার কিনেছিলাম। নিজের উপার্জনের পয়সা দিয়ে কিনি এই জন্যে যে, তা আমি দেয়ালে ডিসপ্লে করে উপভোগ করি। ছবির আত্মার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। একটি সামান্য লাইনও আমার কাছে অনেক বড়ো কিছু । ওই লাইনটি দিগন্ত ছাপিয়ে অনেক দূরে নিয়ে যায় ।
শিল্পকর্ম কালেকশন করতে অনেক টাকা লাগে না। বড় লোক হতে হয় না। প্যাশনটি থাকতে হয়। দর্শন থাকতে হয়। আমাদের একটি ভুল ধারণা আছে, পেইন্টিং কালেকশন করতে ধনী হতে হয়। এটা ভুল। সমকালীন বিশ্বে মডার্ণ কন্টেম্পোরারী আর্টের একজন অন্যতম বড়ো আর্ট কালেক্টর ছিলেন একজন পোস্ট অফিসের কেরানী। কেরানীগিরি করে কিস্তিতে কিস্তি ছবি কিনতেন তিনি। তাঁর নাম হারবার্ট ভোগেল। নিউ ইয়র্ক সিটিতে থাকতেন, মাত্র দুই রুমের ফ্লাটে। যেসব শিল্পীদের কাজ বিলিয়ন ডলার বর্তমানে, তাঁদের মতো খ্যাতনামা শিল্পীদের কাজও তাঁর সংগ্রহে ছিলো। এক সময় বিশাল সংগ্রহ হয়েছিলো তাঁর। তিনি জীবনে একটি ছবিও বিক্রি করেননি। মৃত্যুর আগে তাঁর সংগ্রহের সব শিল্পকর্মগুলো দান করে গেছেন নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ণ আর্ট মিউজিয়ামে। তাঁকে নিয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমার বান্ধবী মন্দিরা ভাদুরী ‘শিল্পপ্রভা’ ম্যাগাজিনে অসামান্য একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন । সব দেশেই ধনীরা ছবি কালেক্ট করে ঘর সাজানোর জন্য। সোফার সঙ্গে, ঘরের পর্দার সঙ্গে, মেঝের কার্পেটের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে পেইন্টিং কিনে। অথবা বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি কোটি টাকায় সংগ্রহ করেন। সে অন্য প্রসঙ্গ। বইয়ের সংগ্রহও তাই । আমি আমার প্রিয় বিষয়ের বইগুলো সংগ্রহ করি। অল্প অল্প করে। আমি কিস্তিতেও বই কিনেছি। আমার কবি, লেখক বন্ধুদের লেখা বইও কিনি। তারা অনেকেই জোর করে উপহার দিতে চান। আমি তা গ্রহণ করি না। (একমাত্র মন্দিরা ভাদুরীর উপহার দেয়া আর্টের বইগুলো গ্রহণ করেছি কারণ আমেরিকাতে অমন সব বৃহদাকার আর্টের বই কেনা আমার জন্য সম্ভব হতো না)। তবে বই অবশ্যই কিনি এবং পড়ি। যে বই পড়ব না, তেমন বই কিনি না।
বইয়ের সঙ্গে আত্মার যোগ না হলে, জীবনবোধ আবিষ্কার করতে না পারলে, সেই বই আর পড়া হয় না । সেই বইগুলো আলাদা সরিয়ে রাখি। বই খুবই ব্যক্তিগত। আমার অভ্যেস এমন হয়েছে— আমি প্রতিদিন বাইরে যাবার সময় আলাদা এক ব্যাগ বই আমার সঙ্গে রাখি। না হলে হাসফাঁস করি। আমার লিভিং রুম, টেবিল, বিছানা, স্টাডি বই আর বই। বই আমি এতো ভালোবাসি! ওরা আমার জীবনের অনেক কিছু। যে বাড়িতে বই থাকে না- তাঁরা কী করে বাস করেন ? কী করেই বা জীবন যাপন করেন! কী নিয়ে বেঁচে থাকেন তা আমার কাছে বিস্ময়ের । আমি অনেক অধ্যাপকের বাসাতেও দেখেছি বই নেই! পেইন্টিং তো নেই ই! কথা হচ্ছিলো শমিক বন্দোপাধ্যায়কে নিয়ে। ‘সদ্য ৮০ বছর পেরলেন এই সম্পাদক-প্রকাশক, অভিধান রচয়িতা এবং বিবিধ বিদ্যা চর্চাকারী মানুষটি। এই সব পরিচিতির মাঝখানে লুকিয়ে রয়েছে তাঁর আরেকটি পরিচয়। তিনি গ্রন্থ সংগ্রাহক। ৪০ হাজারেরও বেশি বই ও পত্রিকা রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। এই বিপুল সংগ্রহের একাংশ শমীক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তাঁর বাবা সুনীত বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের নামকরা অধ্যাপক। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিরিশের দশকে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি পান তিনি। এই ৪০ হাজার বইয়ের মধ্যে তাঁর সংগ্রহ থেকে রয়েছে কম করে ৫ হাজার বই। সেই সঙ্গে রয়েছে শমীকের মেজদা সমাজবিদ সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগ্রহেরও বেশ কিছু বই’। তথ্যসূত্র : ‘বইয়ের বিপুল বৈভব এবং অতীতের সঙ্গে অনন্ত ভবিষ্যতের আত্মকথন’ : অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা ২১ জুন ২০২১, ১০:৩৩। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]