• প্রচ্ছদ » » বিশ্বমানের গবেষক পেতে হলে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে


বিশ্বমানের গবেষক পেতে হলে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে

আমাদের নতুন সময় : 13/09/2021

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো ভারতকে ভীষণ সম্মানের চোখে দেখে। সেটা কি ভারতের অর্থবিত্তের জন্য? অস্ত্রের ক্ষমতার জন্য? মোটেও না। ভারতের লেখাপড়ার মান। যেমন পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যে শাখায় ভারতের কোনো টপ ৎধহশরহম বিজ্ঞানী নেই। আর গবেষণার এই ধারাবাহিকতায় তারা করোনার ভ্যাকসিন তৈরি করতে পেরেছে। হঠাৎ করে কোনো দেশ এরকম বড় আবিষ্কারের অংশ হতে পারে না। এর পেছনে লম্বা সময় ধরে গবেষণার সংস্কৃতি লাগে। বর্তমান বিশ্বে ভারত থেকেও অনেক উন্নত দেশ আছে তারা পারেনি। ভারত তার নিজস্ব ভ্যাকসিন বানাতে পেরেছে এবং একইসঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে তাদের করোনা ভ্যাকসিন তৈরিতেও সফলতার সঙ্গে কাজ করতে পেরেছে। গবেষণায় একই কথা বলা যায় চীনের ক্ষেত্রে। চীনের আজকের অবস্থানে আসার পেছনের কারিগর কারা? ঈ. ঘ ণধহম বা ণধহম ঈযবহ-ঘরহম, ঞ উ খবব এবং ঈ. ঝ. ডঁ তাদের কথা না বললেই নয়। তাদের নেতৃত্বে চীন-আমেরিকার মধ্যে ৫০ থেকে ৭০ দশকে গবেষণায় কোলাবোরেশনের নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। তারও আগে চীন ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালের দিকে ৮০০০ চীনা বিজ্ঞানীকে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়াতে ডিপ্লোমা/পিএইচডি করতে পাঠায়। এটা ছিলো শিক্ষার উন্নয়নে তাদের প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপের শুরু ১৯৭০-৭১ এর দিকে ঢ়রহম-ঢ়ড়হম ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে। এটা শুরু হয় রিচার্ড নিক্সনের চীন সফরের মাধ্যমে। ওই সফরের পরপরই অসবৎরপধহ ংপরবহঃরংঃং ড়ভ ঈযরহবংব ফবংপবহঃ চীন সফরে আসেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিদ অধ্যাপক ঈ.ঘ. ণধহম এবং ঞ.উ. খবব সঙ্গে অনান্যরাও। তারা প্রতিবছর দলবেঁধে এসে এসে ক্লাস, ষবপঃঁৎব, সেমিনার ইত্যাদি দেওয়া শুরু করেন যার মাধ্যমে একটা প্যারাডাইম শিফট হয়। তৃতীয় বা বর্তমানে শেষ ধাপে তারা সহস্র ট্যালেন্টস হান্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে চাইনিজ অথবা নন-চাইনিজ সেরা বিজ্ঞানীদের বিশ্বমানের বেতন ও সুবিধা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ওখানে সরকার এবং মন্ত্রণালয়ের আমলারা গবেষকদের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে এবং যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করে না। করোনা ভাইরাস ছড়ানো শুরু হয় চীনে। সেখান থেকে সারা বিশ্বে ছড়ালেও তারাই সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত। স্বল্প সময়ে তারাই ভ্যাকসিন বানাতে সক্ষম হয়। এতো লম্বা সময় ধরে গবেষণার সংস্কৃতিই তাদের অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সকল সফলতার পেছনের কারণ। এসব উদাহরণ দেখেও আমাদের সরকার এসব মডেল অনুসরণ করে না। শুধু তাই না। আমরা চলছি উল্টো পথে। ভালো খারাপের পার্থক্য না করে গবেষণা ও শিক্ষকতাকে মানহীন করে ফেলছি। এখন পর্যন্ত একটি বিশ্বমানের ইনস্টিটিউট হয়নি যার মাধ্যমে বিদেশে থাকা আমাদের সেরা গবেষকদের বছরে অন্তত ৩ মাস থেকে ১ বছরের জন্য এনে আমাদের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অনুপ্রাণিত করতে পারে। প্রতিবছর আমাদের শতশত শিক্ষার্থী ইউরোপ আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য যাচ্ছে কিন্তু তারা ফিরে আসলে কোথায় তাদের ধপপড়সসড়ফধঃব করে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায় তার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমাদের আনবিক শক্তি কমিশনে এন্ট্রি লেভেল এখনো মাস্টার্স পাস এবং ৩০ বছর বয়স সীমা।
যারা বিদেশ থেকে পিএইচডি এবং/অথবা পোস্ট-ডক করে আসলে তাদের বয়স ৩০ পার হয়ে যায় সঙ্গত কারণেই তাহলে তারা ফিরে আসলে কি করবে? সরকারি কর্মকর্তাদের পিএইচডি করতে রাষ্ট্রের টাকায় পিএইচডি করতে বিদেশে পাঠানো হয়। প্রশাসনে পিএইচডি যদি দরকারই হয় তাহলে সরাসরি পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগের ব্যবস্থা করুন। তাতে সরকারের খরচের যেমন সাশ্রয় হবে তেমনি আমাদের মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও হবে। শিক্ষা ও গবেষণায় উন্নতি সফলভাবে করতে পেরেছিলো বলেই বিশেষ করে চীন আজকে অর্থনৈতিকভাবে সফল এক জাতি। পৃথিবীর কাছে বিস্ময়। তাহলে আমাদের চোখের সামনেতো মডেল আছেই। নতুন করে গবেষণা করে উন্নয়নের নতুন মডেল আবিষ্কারের দরকার নেই। উপরের দুটি কাজ সঠিকভাবে করতে পারলেই ংঁংঃধরহধনষব উন্নয়ন অবধারিত। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার এগুলোই একমাত্র রাস্তা। মনে রাখতে হবে আগে শিক্ষায় উন্নতি পরে অর্থনৈতিক উন্নতি কারণ উন্নয়ন যারা করবে তারাতো মানুষ। সে উন্নত মানুষ ছাড়া উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব আমি সত্যিই বুঝি না। এই সামান্য কথাগুলা বোঝার মতো ক্ষমতা কি আমাদের সরকারের নেই?নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দুর্নীতির দিকে মনোযোগ বেশি লাভজনক?
শিক্ষার উন্নতি মানে মানের উন্নতি। সংখ্যার উন্নতি নয়। আমাদের শিক্ষায় মান যে কমছে তার একটি প্রমাণ হতে পারে আমাদের দেশে সৎ আদর্শবান প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে। তাই আসুন আগে একটি বিশ্বমানের ইনস্টিটিউট করি যেখানে দেশের গবেষক, প্রবাসী গবেষক এবং বিদেশি গবেষক মিলে এক সঙ্গে কাজ করে আমাদের নতুন প্রজন্মকে গবেষণায় অনুপ্রাণিত করে একটি বিপ্লবের সূচনা করতে পারি। বিদ্যমান কাঠামোতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি ইনস্টিটিউটগুলোর মাধ্যমে এই বিপ্লব সম্ভব না। বিশ্বমানের গবেষক পাইতে হলে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এইটা দিতে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাদের দেশদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। এটাও একটা মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমাদের জয়ী হতেই হবে। জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ দেশেতো এখন কোনোকিছু ভাইরাল না হলে সরকার তার সমাধান করে না। শিক্ষার ইস্যুগুলো ভাইরাল করা জনগণের দায়িত্ব। এর মাধ্যমেই সরকারকে চাপ দিতে হবে। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]