• প্রচ্ছদ » » করোনা মোকাবেলায় সরকারি উদ্যোগ : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিআরআইসিএম একটি অনন্য দৃষ্টান্ত


করোনা মোকাবেলায় সরকারি উদ্যোগ : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিআরআইসিএম একটি অনন্য দৃষ্টান্ত

আমাদের নতুন সময় : 22/09/2021

মাসুদ হাসান : [২] ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা (কোভিড-১৯) রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকে এই রোগ প্রতিরোধ ও মোকাবেলায় সরকার নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সরকারের এসকল কার্যক্রমে সহযোগী হিসেবে, করোনা মোকাবেলায় জনগণকে সহায়তা করার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনাধীন বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস্ (বিআরআইসিএম) মাননীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর উৎসাহে-সহযোগিতায়-অনুপ্রেরণায় যথাযথ মান নিশ্চিত করে, সাশ্রয়ী মূল্যে, আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
[৩] ‘বি ক্লিন’ হ্যান্ড স্যানিটাইজার : এই মহামারী বিস্তৃত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই করোনা প্রতিরোধে সাবান-পানি অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবানুমুক্ত করাকে একটি মোক্ষম উপায় হিসেবে নির্ধারণ করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিআরআইসিএম মার্চ ২০২০ সালের প্রথমার্ধ্ব থেকেই নিজেদের ল্যাবরেটরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফর্মুলা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ আইসোপ্রোপাইল এলকোহল সহযোগে যথাযথ মান নিশ্চিত করে ‘বি ক্লিন’ নামে হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন শুরু করে। এই স্যানিটাইজার হাত সম্পূর্ণরূপে জীবানুমুক্তকরণে ব্যবহারোপযোগী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার। মহামারীর প্রথম ৬ মাস, অর্থাৎ মার্চ থেকে আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর ৬টি সরকারি হাসপাতালে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল) প্রতিদিন বিনামূল্যে ১৫ লিটার করে হ্যান্ডরাব/স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা, হাসপাতাল ও ব্যক্তি পর্যায়ে হ্যান্ডরাব, স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় এক লক্ষ তিন হাজার লিটার হ্যান্ডরাব, স্যানিটাইজার উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/ বিভাগ/সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে এই স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়েছে। স¤প্রতি কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ৩,১০,৯০০ টি ২৫০ এমএল বোতল বি ক্লিন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ক্রয় করেছে। বর্তমানে বিআরআইসিএমের প্রতিদিন হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ৫ হাজার লিটার।
[৪] স্পেসিমেন কালেকশন কিট-ভাইরাল ট্রান্সপোর্ট মিডিয়াম (ভিটিএম) : হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন-বিতরণের পাশাপাশি কোভিড-১৯-এর নির্ভরযোগ্য টেস্টের জন্য সঠিক পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহে সিডিসি, ইউএসএর ফর্মুলা অনুযায়ী স্পেসিমেন কালেকশন কিট-ভাইরাল ট্রান্সপোর্ট মিডিয়াম (ভিটিএম) প্রস্তুত করেছে বিআরআইসিএম। এই কিটে আছে, (১) নমুনা সংরক্ষণের জন্য এন্টিবায়োটিক ও এন্টিফাঙ্গাল উপাদান সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত ভিটিএম; (২) নাক ও মুখগহŸরের জন্য ২টি সোয়াব স্টিক; (৩) টাং ডিপ্রেসর। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃক ইতোমধ্যে প্রায় ২১ লক্ষ কিট ক্রয় করা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারা দেশে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিটি কিটের মূল্য ১২০/- থেকে ১৬৬/- টাকার মধ্যে, যা এই মান ও উপাদানে প্রস্তুত আমাদানীকৃত কিটের বাজার মূল্য থেকে অনেক কম। অলাভজনকভাবে উৎপাদনমূল্যে এ কিট সরবরাহ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ছাড়াও র‌্যাব হেডকোয়াটার্স, কেন্দ্র্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারেল সেন্টারসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃক এই কিট ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কিট উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক গড়ে ৫০ হাজার সেট। [৫] স্যাম্পল স্টোরেজ রিয়েজেন্ট : ভিটিএম ছাড়াও রুম টেম্পারেচারে সংরক্ষণযোগ্য ‘স্যাম্পল স্টোরেজ রিয়েজেন্ট’ প্রস্তুত করেছে বিআরআইসিএম। যার মধ্যে রয়েছে (১) নমুনা সংরক্ষণের জন্য সল্ট, কায়োট্রপিক এজেন্ট, গি�সারল ইত্যাদি উপাদান সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত ‘স্যাম্পল স্টোরেজ রিয়েজেন্ট’, (২) নাক ও মুখগহŸরের জন্য দুইটি সোয়াব স্টিক। উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় এর মূল্য ৮০ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের স্যাম্পল স্টোরেজ রিয়েজেন্ট উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক গড়ে ৫০ হাজার সেট।
[৬] বি ক্লিন ডিজইনফেকটেন্ট : অস্ট্রেলিয়ার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল কর্তৃক সুপারিশকৃত পদ্ধতিতে যথাযথ মান নিশ্চিতকরে প্রস্তুত করা হয়েছে বি ক্লিন ডিজইনফেকটেন্ট, যা ঘরের মেঝে, রাস্তা ঘাট, যেকোন নন-লিভিং সারফেস জীবাণুমুক্তকরণে ব্যবহারোপযোগী। এই প্রতিষ্ঠানের ডিজইনফেকটেন্ট উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক গড়ে ২ হাজার লিটার।
[৭] জিরোফাঙ্গাস স্পোরিসাইডাল : বিআরআইসিএম কর্তৃক প্রস্তুতকৃত জিরোফাঙ্গাস একটি বিশেষ ধরণের জীবাণুনাশক যা, ক্লিনরুম সারফেস, ওষুধ শিল্প, বায়োটেকনোলজি, মেডিক্যাল পণ্য, প্রসাধনী ও পুষ্টি শিল্পের যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারোপযোগী, এটি বø্যাক ফাঙ্গাসসহ বিভিন্ন জীবাণু ও স্পোর ধ্বংস করে। বিআরআইসিএমের জিরোফাঙ্গাস স্পোরিসাইডাল উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক গড়ে ২ হাজার লিটার। এগুলো ছাড়াও বিআরআইসিএম করোনা ভাইরাস ধ্বংসকারী বিভিন্ন ডিভাইস তৈরী করেছে।
[৮] অটোমেটিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ডিসপেনসিং ডিভাইস : এই ডিভাইসটি স্পর্শ পরিহার করে হাত জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহারোপযোগী। এক লিটার ধারণক্ষমতার এই ডিভাইসে বি ক্লিন হ্যান্ডরাব/ স্যানিটাইজার ব্যবহৃত হয়। হাত ডিভাইসের নিচে স্থাপন করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট পরিমানে স্প্রে হয়। ইতোমধ্যে এই ডিভাইসটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পুলিশ হেড কোয়াটার্স, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিশু একাডেমী, মালয়েশিয়ান পাম ওয়েল কাউন্সিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ ও ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।
[৯] ইউভি-সি ডিজইনফেকশন চেম্বার : করোনা ভাইরাসসহ সকল ধরণের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি জীবাণু ধ্বংসকারী ২৫৪ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ইউভি-সি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত এই ডিজিনফেকশন চেম্বারে রক্ষিত নথিপত্র, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মোবাইল, চাবি, চশমা ইত্যাদি তিন মিনিটে জীবাণুমুক্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পুলিশ হেড কোয়াটার্স, হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, ওএমসি হেলথকেয়ার প্রাঃ লিঃ প্রভৃতি স্থানে এই ডিভাইসটি স্থাপিত হয়েছে।
[১০] ইউভি-সি ডিজইনফেকশন কনভেয়র কেবিনেট : করোনা ভাইরাসসহ সকল ধরণের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি জীবাণু ধ্বংসকারী ২৫৪ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ইউভি-সি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত এই ডিজিনফেকশন কনেভেয়র কেবিনেটে রক্ষিত খাদ্যসামগ্রী (যেমন- শাক-সবজি, ফলমূল, তৈরী খাবার প্রভৃতি) স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ ও প্রকৃতি অপরিবর্তিত রেখে তিন মিনিটে জীবাণুমুক্ত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ডিভাইস।
[১১] বঙ্গসেফ ওরোন্যাজাল স্প্রে : বিআরআইসিএম স¤প্রতি আরও একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিআরআইসিএম উদ্ভাবন করেছে করোনা ভাইরাস ধ্বংসকারী বঙ্গসেফ ওরোন্যাজাল স্প্রে। নির্দিষ্ট সময়ে (৪ ঘন্টা) পরপর এই স্প্রে দুই নাকে ও মুখগহŸরে ব্যবহার করলে ফ্যারিংসে অবস্থানকারী ভাইরাস ধ্বংস হয়, ফলে সংক্রমণের মাত্রা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে যায়। সাথে সাথে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়। ল্যাবরেটরি, প্রাণিদেহ ও মানবদেহে প্রাথমিক স্টাডি (ট্রায়াল) শেষে বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল কর্তৃক অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে তিনটি হাসপাতালে ৪৮৪ জন রোগি ও ১০ জন সুস্থ ব্যক্তির উপর চূড়ান্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হয়েছে। ট্রায়ালে স্প্রেটি ভাইরাস ধ্বংসে কার্যকর এবং এটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তামানে এই স্প্রে উৎপাদনের অনুমতির জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিবেচনাধীন রয়েছে। অনুমতি প্রাপ্ত হলে, বিআরআইসিএমে বঙ্গসেফ ওরোন্যাজাল স্প্রে উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে দৈনিক গড়ে ১ লক্ষ।
বিআরআইসিএমের এসকল উদ্যোগই অলাভজনক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিআরআইসিএমের এসকল উদ্যোগ প্রসংশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় ও সমর্থনে বিআরআইসিএমের করোনা প্রতিরোধে গৃহীত এসকল কার্যক্রম বিরামহীনভাবে চলমান রয়েছে। একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মত যে, বাংলাদেশে করোনা মহামারীর শুরু থেকে এই পর্যন্ত বিআরআইসিএম একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. মালা খানের নেতৃত্বে এর বিজ্ঞানী-কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ কোন ছুটি না নিয়ে দিন-রাত কাজ করে চলেছেন। সরকারি ছুটির দিন, এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত তারা কাজ করে থাকেন। সরকারের একটি বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরআইসিএম করোনা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সরকার ও জনগণকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]