• প্রচ্ছদ » » গাঁয়ের এক ফুপুকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে


গাঁয়ের এক ফুপুকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে

আমাদের নতুন সময় : 22/09/2021

সাদাত হোসাইন: গাঁয়ের এক ফুপুকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে। ‘পাত্রের চাচা বললো, মাটিত পানি ঢালেন’। সকলে হন্তদন্ত হয়ে পানি ঢাললেন মাটির মেঝেতে। পাত্রের চাচা পান চিবুতে চিবুতে বললেন, দেখি মা, খালি পায়ে এই পানির মধ্যে হাঁটো’। ফুপু হাঁটলেন। শুকনো মাটিতে তার ভেজা পায়ের তালুর ছাপ পড়েছে। সেই ছাপের দিকে দীর্ঘসময় তাকিয়ে রইলেন পাত্রের চাচা। পানের পিক ফেলতে ফেলতে বললেন, ‘নাহ এই মাইয়া অইব না। এই শঙ্খিনী। শঙ্খিনী মাইয়া হয় অস্থির’। ধর্মে মন থাকে না। পরপুরুষের প্রতি আসক্ত হয়, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে না। এই মাইয়া বাদ’। তিনি পায়ের ছাপ দেখে মেয়ের ভালো মন্দ বলে দিতে পারেন। তার মতে, মাইয়া মাইনষের কপাল লেখা থাকে পায়ের তলে। পদ্মিনী নারী সবচেয়ে ভালো। আয়তলোচন, নারীসুলভ সরলতা ও সজ্জলতা। স্বর মধুর, বচন সুমিষ্ট, ব্যবহার নমনীয়। ধর্মপরায়ণা, মৃদুভাষিণী, সদা হাস্যময়, পতিব্রতা। নারী জাতির মধ্যে তারাই সর্বোত্তম। সবচেয়ে খারাপ, হস্তিনী। তারা স্তুলাঙ্গী, মেদবহুল, স্বার্থান্বেষী। মুখে নির্লজ্জতা থাকে। তারা অধিক কৃচ্ছতায় কষ্ট পায় তবুও তাদের স্বার্থভাব কমে না। পরপুরুষের প্রতি সর্বদা আকৃষ্ট থাকে। ধর্মে কর্মে মত থাকে না। তারা নারী জাতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিচু। আমার সেই ফুপু সর্বাপেক্ষা নিচু কি না জানা হলো না, তবে তার ভালো কোনো উঁচু বংশের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হলো না। মেয়েদের তখন, ভালো বিয়ে হতে হলে লম্বা চুল থাকতে হয়, গায়ের রং থাকতে হয়, পায়ের ছাপে পদ্মিনী নারীর খাতায় নাম লেখা থাকতে হয়। সূরা কালাম জানা থাকতে হয়। ফুপু সারাদিন গুনগুন করে সূরা ইয়াছিন মুখস্ত করতেন।
বিষয়টি এমন না যে তিনি সূরা ইয়াছিন জানতেন না। সূরা ইয়াছিন তার ঠোঁটস্থ। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, পাত্রপক্ষের সামনে গেলেই তিনি সবকিছু গুলিয়ে ফেলতেন। এর আগে অনেকবারই তাকে সূরা ইয়াছিন জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তিনি প্রথম লাইনটাই মনে করতে পারেন নাই। শুধু সূরা ইয়াছিনই না, একবার পাত্রের মামা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সূরা ফাতিহাতো পারো? না কি তাও পারো না’? ফুপুর সারা শরীর কাঁপতে লাগল, তিনি মনে করতে পারছেন না, সূরা ফাতিহা কোনটি? অথচ পাত্রপক্ষ চলে যেতেই তিনি দিব্যি সবকিছু গড়গড় করে বলে যেতে পারতেন। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। পাত্রস্থ হওয়ার পরীক্ষা অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ংকর আতঙ্ক। ভয়াবহ আতঙ্ক, যদি পছন্দ না করে, তাহলে? তাহলে কী হবে? এই আতঙ্কে সব এলোমেলো। ফুপুর লম্বা চুল ছিলো না, গায়ের রং ছিলো না, পায়ের ঢং ছিলো না। তার বিয়ে হলো নিচু গরিব এক বংশে। ছেলের এক পায়ে সমস্যা, টেনেটেনে হাঁটে। বোকাসোকা। শিক্ষাদীক্ষা নেই। সে জামাই নিয়ে ফুপু জীবন কাটিয়ে দিলেন। শুধু যে কাটিয়েই দিলেন, তা-ই না। জীবনটাকে ফাটিয়েও দিলেন। একটাই মেয়ে তার। সেই মেয়ে গ্রাজুয়েশন করেছে। চাকরিও করে। মেয়ের জন্য ফুপু পাত্র দেখছেন। সমস্যা হচ্ছে, মেয়ে হয়েছে অবিকল তার মতো। মেয়ের লম্বা চুল নেই, শরীরের গড়ন নেই, ভালো গায়ের রং নেই। পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে। এসে চলে যাচ্ছে। ফুপু সেদিন দেখতে আসা এক পাত্রপক্ষকে বললেন, ‘মাটিত পানি ঢালুম’? সবাই অবাক হয়ে তাকাল। বললো, ‘মাটিতে পানি ঢালবেন ক্যান’? ফুপু বললেন, ‘দেখবেন, আমার মাইয়া পদ্মিনী, চিত্রিণী, শঙ্খিনী না হস্তিনী? পায়ের পাতায় মাইয়া মাইনসের কপাল লেখা থাকে, ভালোমন্দ লেখা থাকে। দ্যাখেন, দ্যাখেন’। পাত্রের বাবা হাসতে হাসতে বললেন, ‘কি যে কন? সেই যুগ কি আর আছে? যুগ বদলাইছে না’? ফুপুও হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘যুগ বদলাইছে, কিন্তু মানুষ কি বদলাইছে? বদলায়নি। মাইয়া মানুষ মাইয়া মানুষই আছে, আর পুরুষ মানুষ পুরুষ মানুষই’। পাত্রের বাবা কোনো কথা বললেন না। ফুপুও না। কোথাও কোথাও শব্দের চেয়ে নৈঃশব্দ ভালো। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]