• প্রচ্ছদ » » এ দেশের নারীদের মূল্য, অমূল্য ও দুর্মূল্য!


এ দেশের নারীদের মূল্য, অমূল্য ও দুর্মূল্য!

আমাদের নতুন সময় : 25/09/2021

মুনমুন শারমিন শামস্ : ভেতরটা চুরমার হয়ে গেলেও বিয়ে ভাঙা যায় না। চোখের সামনে সঙ্গী পুরুষের প্রতারণা টের পেলেও সেই বিয়ে ও বিছানা কামড়ে পড়ে থাকতে হয়। স্বামী দুর্ব্যবহার করে, কানাকাড়ি মূল্য দেয় না, তবু সেই স্বামীর সঙ্গে ঘর ও ছাদ শেয়ার করতে হয়, থাকতে হয় সেই লোকটিরই বাপ-মা, ভাই-বোনের সঙ্গে। কেন? কারণ এই সমাজে বিয়ে ভাঙার চেয়ে ভয়ানক ঘটনা আর দ্বিতীয়টা নেই। ডিভোর্স এই সমাজে সবচেয়ে গর্হিত শব্দ। আর তারো চেয়ে খারাপ ডিভোর্সড মেয়ে, ডিভোর্সী মানেই তাকে স্বামী ছেড়ে গেছে, সে স্বামী পরিত্যাক্তা। ডিভোর্স যেহেতু নোংরা, ডিভোর্সী যেহেতু নষ্টা, তাই মেয়েদের ছোটকাল থেকে শেখানো হয়, মরে গেলেও যেন সংসার না ভাঙে। স্বামীতে পিটাক, শ্বশুরে খ্যাদাক, শ^াশুরীতে মুখ ঝামটা দিক, তুমি মাটি কামড়ায়ে পইড়া থাকবা কাবিননামা ধইরা। তা তুমি যতো বড় ক্যারিয়ারের মেয়ে হওনা কেন, যতো টাকা কামাই করো না কেন, ওসবে কিসসু যায় আসে না। তুমি যতোই বিদ্বান আর রোজগেরে হও, তোমার স্বামীরে ছাড়বা না। বিবাহ একবারই হয়। তো, বিবাহ যেহেতু একবারই হয়, তাই, বিবাহ টিকায়ে রাখতে সবকিছুই করতে হবে। দরকারে পীর ফকির ধরতে হবে, স্বামীর পায়ে পড়ে থাকতে হবে, দশজনরে মুরুব্বি ধরে সালিশ বসাতে হবে। যেন তেন প্রকারেই হোক, বিয়ে টিকা চাই। বিয়ে মানে তো দুইজনের মন ও শরীরের মিল আর জীবনের পার্টনারশিপ না। বিয়ে হইলো এই সমাজে এই বাড়ির লগে আরেক বাড়ির বিবাহ। তাই চৌদ্দগোষ্ঠী নিয়ে বিয়ে টিকানোর যুদ্ধ করা লাগে।
তো, যখনই স্বামীতে গুতা দেয়, লাথি মারে, পরকীয়া করে, অপমান করে, অশ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে না, তখনই মেয়েরা অকূল দরিয়ায় পড়ে। কারণ এই কথা তো সে কাউরে বলতে পারবে না। না বাপরে, না মায়েরে, না বোনেরে, না ভাইয়েরে। বললে সবাই বলবে, বিয়ে টিকা, বিয়ে টিকা। বিবাহ যেন না ভাঙে। বিবাহ ভাঙলে বাপের হার্ট অ্যাটাক হয়, মায়ের পালপিটিশন হয়, ভাইয়ের সম্মান যায়, বড় বোনের মাথা হেট হয় এবং ছোট বোনের বিয়ার সম্মন্ধ ভেঙে যায়। ডিভোর্সড মেয়ে বাড়িতে থাকলে পুরা বাড়ির সম্মান ধুলায় মিশে যায়। পুরা বংশের মুখে কালা রঙ লাগে। মেয়ে বংশের বাত্তি জ্বালায় না ঠিকই, কিন্তু কলংকের সব রঙ মাইয়ারে দিয়াই লাগে। তো, মেয়ে তখন কী করে? মেয়ে তখন সহ্য করে। লাথি সহ্য করে। গুতা সহ্য করে। অপমান, অবহেলা, অশ্রদ্ধা, প্রতারণা সবই সহ্য করে। সহ্য করে এই কারণে, যেকোনো প্রকারে হউক তারে বিবাহ টিকাইতে হবে। সংসার টিকাইতে হবে। তার সংসার টিকানোর উপ্রে বাপের হার্ট, মায়ের ব্লাড প্রেশার, ভাইয়ের উঁচু মাথা আর বোনের সম্মান লজ্জা ইত্যাদি সব নির্ভর করতেসে। তাই সে লাথি জুতা খায়, তবু বিয়া ভাঙে না। এদিকে বাচ্চাও আছে। বাচ্চাদের একা মানুষ করার মেরুদণ্ডও নেই। কিংবা থাকলেও বাড়ির লোকে সেই মেরুদণ্ডরে দুই পয়সা দাম দেয় না। ফলে যেটুকু আত্মবিশ্বাস তার ছিলো, তাও জলের সঙ্গে ভেসে যায়। আবার বাচ্চার অভিভাবকত্বের ব্যাপারও আছে। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর আইন আছে। তারা ঠিক করে দিসেন, বাচ্চা মায়ের জরায়ুতে জন্মাইলেও, মায়ের দুধ খায়া বাঁচলেও, বাচ্চা আসলে বাপের। মায়ের কানাকড়ি মূল্য নেই। এসব সাত পাঁচ ভেবে ভেবে, মেয়েরা বিবাহ আঁকড়ায়ে পইড়া থাকে। সংসারে পা চাটে বা চাটার ভাব ধরে। অভিনয় করে। কিংবা চরম বিষাদে ভেতরে ভেতরে মরে পড়ে থাকে। শরীরটা হাঁটে চলে কিংবা তাও চলে না। এরপর একদিন কোনো কোনো মেয়ে আর পারে না, তখন তারা ইভানা লায়লা চৌধুরীর মতো ছাদ থেকে লাফ দেয়। কিংবা হয়তো স্বামীতেই ধাক্কা দিয়া ফালায়ে দেয়। বহুদিনের ডিপ্রেশন, মনোমালিন্য, মতের অমিল, মনের অমিল, অশ্রদ্ধা, অবহেলা, অপমান- সব এক ধাক্কায় সমাধান হয়ে যায়। মেয়ে মরার পর সেই বাপ-মায়ের হার্ট লিভার কেমন থাকে কে জানে, যে হার্ট লিভার প্রেশার মেয়ের ডিভোর্সে অসুস্থ হয়! যে ভাই-বোন আত্মীয়দের সম্মান মেয়ের ডিভোর্সে ধুলায় লুটায়, সেই সম্মান একটা লাশের বিনিময়ে সুন্দরমতো খাড়া হয়ে থাকে। এই অসভ্য বঙ্গদেশে মেয়ের লাশের চেয়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিস আর কোনো কিছুই হয় না। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]