• প্রচ্ছদ » » কুমিল্লার মেয়ে আলেয়া, আলো ছড়ালো বিশ্বময়


কুমিল্লার মেয়ে আলেয়া, আলো ছড়ালো বিশ্বময়

আমাদের নতুন সময় : 25/09/2021

এডভোকেট গোলাম ফারুক : কাব্যলক্ষীর বরপুত্রী আলেয়া চৌধুরী পঞ্চাশের দশকে কুমিল্লা শহরের উত্তর চর্থা এলাকার এক হতদরিদ্র পরিবারে জম্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম আম্বিয়া খাতুন ও পিতার নাম সুলতান আলম চৌধুরী। বাবার নামের সাথে চৌধুরী দেখে মনে হয়, একসময় পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি ছিল, সাথে বনেদীপনা। পরিবারটি জীবন সংগ্রামে টিকে থাকলেও নামের সাথে চৌধুরী পদবীর সংযুক্তি ছাড়া আর কিছু ছিলো না তখন। এই পরিবারের মেয়ে আলেয়া বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম নারী বাস কন্ডাক্টর ও গাড়িচালক। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ পরশে তার জীবনের গতি বদলাতে শুরু করলেও ১৫ আগস্টের কালোরাত আবার পাল্টে দেয় আলেয়ার পথচলা। আর এই পথচলাতেই বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠেন আলেয়া চৌধুরী।
দারিদ্রের কারণে শিক্ষার পথ রুদ্ধ হলেও আলেয়া চৌধুরীর কাব্য প্রতিভা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই বিকশিত হতে থাকে। তিনি এক স্বশিক্ষিত নারী। ত্রিশ বছর বয়সে মাছ ধরার নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মার্কিন মুলুকে যান। তিনি বিভিন্ন দেশে গেছেন কাজের সন্ধানে। নানা বর্ণ ও ধর্মের মানুষের একান্ত সান্নিধ্যে এসেছেন; যার ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপক ভাবে প্রসারিত হয়েছে।
আলেয়ার পরিবারটি এতটাই দরিদ্র ক্লিষ্ট ছিল যে,তার সঠিক জম্ম তারিখটিও আজ পর্যন্ত নিরূপণ করা যায়নি। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার বলে কন্যা সন্তানের লেখাপড়ার দিক তেমন আগ্রহ ছিলো না। আর্থিক সঙ্কট ও কন্যা সন্তানের লেখাপড়ার বিষয়ে বিরাট বাধা সত্বেও লেখাপড়ার প্রতি দুর্বার আকর্ষণ আলেয়াকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে আসে। পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে ভর্তি হয়ে যান এলাকার প্রাইমারি স্কুলে। বিষয়টি লোকমুখে শুনে ফেলে পরিবারের সদস্যরা। আলেয়ার ভাগ্যে জুটে বেদম শারীরিক নির্যাতন।
কিন্তু কিছুতেই মানবার পাত্রী নন আলেয়া। স্কুলের এক বান্ধবীর কাছ থেকে জেনেছিলেন, কুমিল্লা শহরে ফরিদা বিদ্যায়তন নামে একটি বালিকা বিদ্যালয় আছে, যার প্রধান শিক্ষিকা ছাত্রীদের লেখাপড়ায় সাহায্য করেন। কাউকে না জানিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে দেখা করলেন ফরিদা বিদ্যায়তনের তৎকালীন প্রধান শিক্ষিকা সেলিনা বানুর সাথে। সেলিনা বানুর সম্পর্কে দুটি কথা বলা প্রয়োজন।
সেলিনা বানু পাবনার মেয়ে, স্বামী শাহাজাহান খন্দকার। স্বামী স্ত্রী দুজনেই সর্বহারা রাজনীতি করেন, কমিউনিস্ট পাটির সদস্য। সেলিনা বানু ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট থেকে নির্বাচন করে পার্লামেন্ট মেম্বার হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পপতি ও হালিমা টেক্সটাইলের মালিক জহিরুল কাইয়ুম তার একমাত্র কন্যা ফরিদার স্মৃতি রক্ষার্থে ফরিদা বিদ্যায়তন নামের বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। স্কুলটির সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য তিনি একজন মানবিক গুণসম্পন্ন প্রধান শিক্ষকের সন্ধান করছিলেন। তিনি কলেজ জীবনের সহপাঠি ও রাজনৈতিক বন্ধু অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদকে এ ব্যাপারে সাহায্য করার অনুরোধ জানান। অধ্যাপক মোজাফফর তার বন্ধু শাহাজাহান খন্দকার ও ওনার স্ত্রী, ৫৪ সালের পার্লামেন্টের সদস্য সেলিনা বানুর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন। সেলিনা বানু ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে যোগদান করেন। এ ব্যাপারে বিপ্লবী অতীন রায় বাবুরও ভূমিকা ছিল।
সেলিনা বানুর কাছে সব খুলে বললেন আলেয়া। তিনি তাকে ফরিদা বিদ্যায়তনে ভর্তি করিয়ে নেন। আলেয়া বাসা বাড়ীর কাজের কথা বলে চলে আসতেন সেলিনা বানুর বাসায়। এই বাসা থেকে সেলিনা বানুর দেওয়া স্কুলের ইউনিফর্ম পরে ক্লাসে যেতেন, ক্লাস শেষ হলে স্কুলের ইউনিফর্ম সেলিনা বানুর বাসায় রেখে তার নিজ পোষাকে বাড়ী ফিরতেন। এই ভাবে চলছিল তার লেখাপড়া। সেলিনা বানু ছিলেন সর্বহারা আদর্শে দীক্ষিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। তাই তার এই ছাত্রীকে স্কুলে পাঠ দানের বাইরে নারীবিদ্বেষী সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শিক্ষা দেন। যা আলেয়ার জীবন চলার পথে অমিত শক্তি হিসেবে কাজ করে।
কিন্ত এরই মধ্যে বিষয়টি পরিবারে জানাজানি হয়ে গেলে অভিভাবকরা তার উপর অকথ্য নির্যাতন করে। মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়। রীতিমাফিক বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে ‘আড়াইয়া’ উপলক্ষ্যে বাপের বাড়ীতে আসে। মাকে জানায়, সে কিছুতেই স্বামীর বাড়ী যাবে না। মা বুঝেছিলেন, এই মেয়েকে জোর করে ঘরে আটকানো যাবে না। মাকে বলেই ঐ রাত্রে বাড়ী থেকে পালিয়ে যান আলেয়া। সমাজের বিরুদ্ধে বিস্ফোরণের আগুন নিয়ে অজানার পথে পা বাড়ালেন। ট্রেনে চড়ে ঢাকা কমলাপুর স্টেশনে পৌছান। স্টেশনের টি স্টলে তার সাথে পরিচয় হলো এক কিশোরীর, তাকে আপ্যায়ন করল চা আর বন রুটি দিয়ে। এই চা দোকানেই তার চাকুরী হল, কাপ প্লেইট ধোয়ার বিনিময়ে জুটল তিন বেলা খাবার। সেখানেই তার সাথে পরিচয় হয় গাড়ী চালক আব্দুল আওয়ালের সাথে। তিনি তাকে তার বাসায় নিয়ে যান। আলেয়ার বয়সী রওশন নামে তার একটি মাতৃহারা কন্যা ছিল। সকাল বেলা কাজে যেতে তাদের দুজনকেই সাথে করে নিয়ে যেতেন আওয়াল ড্রাইভার। এই ভাবে বাসে থাকতে থাকতে আলেয়া বাস কন্ডাক্টর হয়ে উঠেন।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা বাস কন্ডাক্টর হিসাবে সেই সময় আলেয়ার ছবি ছাপা হয়েছিল জাতীয় দৈনিকে। এর মধ্যে আলেয়া পত্রিকা বিক্রির কাজ নেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের প্রবেশ পথের কোণে দাঁড়িয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন। আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে এমন উঠতি বয়সের একটি মেয়ে পত্রিকা হকার! ব্যাপারটি অনেকের নজরে কাড়ে। একদিন চলচিত্র নির্মাতা উদয়ন চৌধুরী আলেয়াকে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞাসা করেন ” তুই আমাকে পত্রিকা দিতে পারবি?” আলেয়া খুশি হয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন। এরপর তিনি একটি কাগজে লিখে দেন বাড়ির ঠিকানা, কীভাবে কোন বাসে যেতে হবে তাও বলে দেন তিনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যখন পত্রিকা দিতে যেতেন আলেয়া, তখন পাশে বেগম সুফিয়া কামালের বাড়িতেও পত্রিকা দিতেন । এর মাস ছয়েক পর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হল। ফলে পত্রিকা বিলি করার কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন আলেয়া।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন আলেয়া একবার কুমিল্লায় গিয়েছিলেন। সেই সময় তার বাড়ীর এলাকার কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ও কিছু তথাকথিত হুজুর তাকে দেখে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। এর কারণ, আলেয়ার গৃহত্যাগের মূল কারণ ছিল আলেয়ার প্রতি তাদের বিরূপ মন্তব্য ও বিদ্বেষ। এমন অবস্থা হলো যে, তাকে আর কিছুতেই বাড়ীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অবস্থা বেগতিক দেখে আলেয়ার মামা আব্দুল মজিদ আলেয়াকে নিয়ে চাঁদপুর যান। সেখান থেকে ঢাকাগামী লঞ্চে তুলে দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালিন আলেয়া সম্পর্কে আর বেশী কিছু জানা যায়নি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র ১৩ বৎসর বয়সে আলেয়া গাড়ী চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে ভর্তি হন একটি ড্রাইভিং স্কুলে। ড্রাইভিং শিক্ষা সমাপ্ত করে আলেয়া হয়ে যান বাংলাদেশের প্রথম মহিলা বাস ড্রাইভার। পেশাদার ড্রইভিং লাইসেন্সের আবেদন করলে মহিলা হওয়ার কারণে আবেদন না-মঞ্জুর হয়।
ইতোমধ্যে আলেয়ার ড্রাইভার হওয়ার খবর পত্রিকায় ছাপা হলে সংবাদটি বঙ্গবন্ধুর নজর কাড়ে। আলেয়াকে গণভবনে ডেকে আনেন বঙ্গবন্ধু। বলেন, “মেয়েদের জন্য বাস ড্রাইভার হওয়া নিরাপদ নয়। আমি তোকে একটা সেলাই মেশিন দেই, সেলাইয়ের কাজ শুরু করে দে। পুরুষশাষিত সমাজের রক্ত চক্ষুকে অগ্রাহ্য করবেন, এটাই আলেয়ার শপথ। তাই বিনয়ের সাথে সেলাইয়ের মেশিন নিতে অস্বীকার করেন এবং তার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। আলেয়া বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন, বাংলাদেশে এমন একটি আইন করতে, যাতে মেয়েরা গাড়ী চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানোকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও অভিমানে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন।
এদিকে বঙ্গবন্ধু তার কেবিনেটের তথ্যমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীকে ফোন করে বলেন, আলেয়াকে খুঁজে বের করে তাকে একটি চাকুরির ব্যবস্থা করে দিতে। বঙ্গবন্ধু জননেতা, তাই বুঝতে পেরেছিলেন আলেয়ার মর্মজ্বালা। তাই আলেয়ার জীবনকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বঙ্গবন্ধুর এ প্রয়াস।
যেই কথা সেই কাজ। মিজান চৌধুরী আলেয়াকে খুঁজে বের করে বাংলাদেশ বেতারে চাকুরী দিয়ে দিলেন। এতদিনে হয়ত আলেয়ার বাউন্ডুলে জীবনের অবসান হল। মিজান চৌধুরীর সাথে সাক্ষাতের সময় তার সঙ্গী হয়েছিলেন সেলিনা হোসেন ও কবি নির্মলেন্দু গুণ। স্বশিক্ষিত কবি আলেয়া চৌধুরী তার বাউন্ডুলে জীবনে কবিতাও লিখেছেন নিরন্তর, ছাপা হয়েছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে। এখন সুশৃংখল জীবনে চলার সুবাদে তার কাব্য প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। এবার তার সাথে পরিচয় ঘটে সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও সোহরাব হাসানের সাথে। আরো পরিচয় ঘটে এক সময়ের বাম রাজনীতির সক্রিয় নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ঘনিষ্ঠ সহচর বীর মুক্তিযোদ্ধা লেখক ও গবেষক আব্দুল মোনায়েম সরকারের সাথে। কবি, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিকদের এক বিশাল বলয়ে আলেয়ার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর উদ্দেশে সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে। এরই সাথে আলেয়ার জীবনে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। পাকিস্তানী ধারার রেডিও বাংলাদেশে চাকুরিতে ইস্তেফা দিয়ে নেমে গেলেন রাস্তায়। কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য স্মৃতিকথা।
আবারো বদলে যায় আলেয়ার জীবনের দৃশ্যপট। দেশে তখন জিয়াউর রহমানের রক্তের হোলি খেলা। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের ফাঁসি যখন নিত্যদিনের খেলাধূলা। কবি আলেয়া চৌধুরীর কলমে তখন আগুন ঝরে। পত্রিকায় তার কবিতা ‘পতিতালয়’ ছাপা হলো। এই কবিতায় দৃষ্টি গেল সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ।
ক্ষুব্ধ জিয়াউর রহমান ডেকে নিলেন আলেয়াকে। বললেন, তুমি দেশ ছাড়ো না হলে মোল্লা মৌলভীরা তোমাকে মেরে ফেলবে, সাথে আমাকেও। সামরিক আইন বলে কথা, সকালে আলেয়ার সাথে এই কথা আর বিকালেই আলেয়াকে জোর করে ধরে নিয়ে যায় বিমান বন্দরে। সেখানে পরিচয় ঘটে বঙ্গবন্ধুর খুনী বজলুল হুদার সাথে এবং তারই সাথে ইরানগামী একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয় আলেয়াকে। বঙ্গবন্ধুর খুনীর সাথে ইরানে বসবাস আলেয়ার জন্য মৃত্যুর সামিল। বজলুল হুদা আলেয়াকে ইরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকুরী দিতে চাইলেও আলেয়া রাজী হননি। বজলুল হুদাকে অনুরোধ করেন অন্যত্র একটি চাকুরী নিয়ে দেওয়ার জন্য। বজলুল হুদা আলেয়াকে ইরানস্থ জার্মান রাষ্ট্রদূতের কাছে নিয়ে যান।
জার্মান রাষ্ট্রদূত আলেয়াকে প্রশ্ন করেন, তুমি কী কী কাজ জানো? আলেয়া উত্তর দেন, গাড়ি চালাতে জানি। রাষ্ট্রদূতের এ কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই তার গাড়ির চাবি আলেয়ার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, যাও গাড়ি স্টার্ট দাও। আলেয়াও তড়িৎ গতিতে গাড়িতে উঠে খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রথমবারেই স্টার্ট দিয়ে গাড়ি চালাতে উদ্যত হলে রাষ্ট্রদূত তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। তারপর বলেন, যাও তোমার চাকরী হয়ে গেল। বিদেশে তুমি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না তাই আমার অফিসে আমার পারসোনাল এটেন্ডেন্ট হিসাবে কাজ করবে। আলেয়ার চাকুরী হয়ে গেল ইরানস্থ জার্মান এম্বেসিতে । কিন্তু অভাগা যে দিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়।
স্বস্তির মাঝে অশনি সংকেত বেজে উঠল। এই জার্মান রাষ্ট্রদূত বদলী হলেন পাকিস্তানে। আলেয়াকে বললেন, আমার সাথে চল পাকিস্তানে। তোমার কোন অসুবিধা হবে না। আলেয়া বললেন, পাকিস্তান আমার ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যা করেছে। আর দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত হরণ করেছে। সেই নরপশুর দেশে আমি কিছুতেই যেতে পারি না। অবশেষে জার্মান রাষ্ট্রদূত বললেন, আমি জার্মান হয়ে পাকিস্তান যাব। তুমি চাইলে আমার সাথে জার্মান যেতে পার। আমি তোমাকে জার্মানিতে রেখে পাকিস্তান যাব। আমি আশাকরি জার্মানিতে তোমার কোন না কোন একটা চাকুরীর ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
জার্মানীতে যেয়ে আলেয়া বুঝতে পারেন, জার্মান ভাষা না জানলে জার্মানীতে থাকা দুস্কর। তাই মনে মনে পরিকল্পনা করেন, যে করেই হোক আমেরিকা পৌছাতে পারলে আমার হয়ত ভাগ্য খুলবে। এখন আলেয়ার একমাত্র চিন্তা কীভাবে আমেরিকায় পৌঁছানো যায়। আমেরিকার উদ্দেশ্যে আলেয়া জার্মানী ছাড়েন এবং জর্ডানে আসেন অভিবাসী হয়ে, সেখান থেকে বাহামা।
এই দেশ থেকে সমুদ্র পথে আমেরিকার যাওয়ার পথ খুঁজছেন আলেয়া, ঘটনা পরিক্রমায় আলেয়ার এখন ৩০ বছর। চোরাই ভাবে সমুদ্র পথে আমেরিকার যাওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে পরিচয় হলো এক নিগ্রো মহিলার সাথে। চুক্তি অনুযায়ী সেই মহিলা আলেয়াকে আরো ১২ জন পুরুষের সাথে তুলে দিল একটি ইঞ্জিন চালিত রাবারের নৌকায়। মনে মনে আলেয়া ভাবল, বাংলাদেশকে যেমন নৌকা মার্কা স্বাধীনতা এনে দিয়েছে তাকেও নৌকাই আমেরিকা পৌছে দেবে। নৌকাতে তুলে দিয়ে ঐ নিগ্রো মহিলা পুরুষ যাত্রীদের শপথ করায়ে বলল, আমি আশা করি তোমরা ১২ জন পুরুষ এই একজন মহিলাকে বিপদে রক্ষা করবে। নিগ্রো মহিলা সংগোপনে যে কাজটি করলেন তিনি আলেয়ার নিকট কিছু জম্ম নিয়ন্ত্রণ বটিকা দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘‘হাজার হলেও পুরুষ মানুষের সাথে যাচ্ছ। কখন কী ঘটে যায়। ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করুক। ‘’ আলেয়া ভেবে নিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে হাজার হাজার মহিলা পাক সেনার হাতে সম্ভ্রম হারিয়েও সংবাদ পৌছে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। আমি তাদেরই বোন। যে কোন যুদ্ধেই আমাকে জিততে হবে, এখানে নৈতিকতা পরাভূত। জীবন যুদ্ধের জয় না সতীত্বের জয়, কার জয় হয় হবে এই যুদ্ধে- একথা শুধু জানেন সৃষ্টিকর্তা। সাগরের উত্তাল তরঙ্গে ভাসছে তরী, দুলছে আলেয়ার আমেরিকায় পৌছানোর স্বপ্ন। উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কোনরূপ দুর্ঘটনা ছাড়াই সোনার তরী আমেরিকার মাটি স্পর্শ করল। বিপত্তি ঘটালো আমেরিকার ইমিগ্রেশন পুলিশ। গ্রেফতার করলো তাদের ১৩জন অভিবাসীকে। আলেয়া পুলিশের কাছে খুব করে কান্নাকাটি করাতে এবং নারী হওয়ায় পুলিশের দয়া হলো। আলেয়াকে ছেড়ে দিল।
প্রসঙ্গত বলে রাখি আলেয়া ইরানে অবস্থানকালে ভারতীয় এক নারী মঞ্জু ব্যানার্জির সাথে পরিচয় ঘটেছিল। যিনি সে সময় নিউইর্য়কে বসবাস করেন। ওনার সাথে যোগাযোগ থাকায় মঞ্জু ব্যানার্জির ঠিকানা জানা ছিল। আলেয়া সাহায্যের আশায় মঞ্জু ব্যানার্জির বাসায় যেয়ে উঠলেন। তখন রাত্রি। এবার বাধ সাধলেন মঞ্জু ব্যানার্জির স্বামী। কিছুতেই আলেয়াকে জায়গা দেওয়া যাবে না। মঞ্জু ব্যানার্জি স্বামীকে বললেন, মেয়ে মানুষ রাত্রিবেলা অপরিচিত শহরে কোথায় যাবে? রাত্রিটা কাটুক। স্বামী রাজি হলেন।
ভোর হলে মঞ্জু ব্যানার্জি আলেয়াকে বললেন, তুমি খানিক সময়ের জন্য ঘুরে আসো। সাহেব অফিসে গেলে তুমি আমার কাছে আসো। কথানুযায়ী তাই হল। রাত্রে স্বামী বাসায় ফিরলে মঞ্জু ব্যানার্জি স্বামীকে বুঝাতে সক্ষম হলেন যে, আলেয়া আমাদের বাড়ীতে থেকে যাক। আমাদের ছেলেকে দেখাশুনা করবে। আলেয়া মঞ্জু ব্যানার্জির দুরন্ত ছেলেটিকে আদরে স্নেহে মানুষ করতে পেরেছিলেন। এই জন্য মঞ্জু ব্যানার্জির পরিবার আলেয়ার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।
কর্মপাগল নারী আলেয়া ইতমধ্যে নিজ মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে সমস্যাক্লিষ্ট শিশুদের জন্য নিউইর্য়কে গড়ে তুলেছেন চাইল্ড হোম। এই সংগঠনের সেবামূলক কাজের জন্য আলেয়া চৌধুরী লাভ করেছেন আমেরিকার রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার, যা তার হাতে তুলে দিয়েছেন তৎকালিন ফার্স্ট লেডী হিলারী ক্লিনটন।
তাঁর অস্তিত্বের সংগ্রামকে স্বীকৃতি দান করে তাকে নিয়ে আমেরিকার ‘সামার’ ম্যাগাজিনে উওম্যান অব দ্য ইয়ার শীর্ষক প্রচ্ছদ কাহিনী প্রকাশ করে। ‘আলেয়া: অ্যা বাংলাদেশী পোয়েট ইন আমেরিকা’ শীর্ষক ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরী করে তাকে সম্মানিত করে। এই ছবিতে মজদুর শ্রেণী থেকে আগত এক নারীবাদী কবির সংগ্রামের কথা চিত্রায়িত হয়েছে। দিনা হোসেন এই ফিল্ম তৈরী করে কলকাতা থেকে ‘‘কলাকিতি’’ পুরষ্কার লাভ করেন, ২০১৬ সনে।
আমি প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছি, কাব্যলক্ষীর বরপুত্রী আলেয়া চৌধুরী। তার এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা মোট ১১ টি। গ্রন্থগুলো হলো: ১. দুঃখের সমান সরল রেখা ২. যুদ্ধহীন নিরাময় পৃথিবী চাই ৩. হৃদয়ে বাংলাদেশ ৪. আমি হার্সেলের নিগ্রো ৫. দ্রোহী ৬. তুমি ৭. মাদার ৮. দ্য ম্যান ফাদার অব বাংলাদেশ
৯. গড কিসড ইট ১০. পোয়েম অ্যাবাউট ট্রুথ ১১. যুদ্ধ। আলেয়া চৌধুরীর মতে, তাঁর সেরা গ্রন্থ দ্য ম্যান ফাদার অব বাংলাদেশ। এটি একটি কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের কবিতাগুলি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করে লেখা। একটি জাতি একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনি। আর এই স্বাধীনতা আনতে গিয়ে মাসের পর মাস তিনি জেল খেটেছেন, পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন। সেই মানুষটিকে অকৃতজ্ঞ কিছু মানুষ সপরিবারে হত্যা করেছে-এ কষ্ট ভোলার নয়। যত দিন এই রাষ্ট্র থাকবে তত দিন অমর তিনি। চিরঞ্জীব তিনি জাতির চেতনায়।
২০০১ সালে আলেয়ার জীবনের ঝড় যখন থেমে গেছে, তখন প্রাকৃতিক এক ঝড়ে আলেয়ার নিউইর্য়কের বাড়ীর একটি গাছ পরে যায়। আলেয়া নিজেই গাছ কাটতে গেলে বুকে ব্যথা অনুভব করেন, তখনই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ধরা পরে, আলেয়ার শরীরে মরণব্যাধি ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। ২০২০ সালে ৩ আগস্ট এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন আলেয়া।
এই মহিয়সী নারী ২০১৭ সালে শেষ বারের মত নিজ শহর কুমিল্লায় এসেছিলেন। তার নূরপুর হাউজিং এস্টেটের বাড়ীতে কর্মজীবী নারীদের জন্য একটি হোস্টেল করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করেন। কুমিল্লার জেলা প্রশাসক আইনগত দিক বিবেচনা করে কীভাবে করা যায় তার জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। আলেয়া চৌধুরী আমার সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগও করেছিলেন। কিন্তু সময় স্বল্পতায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করা হয়নি। নিউইর্য়ক ফিরে গিয়ে আমার সাথে প্রায়শই আলাপ করতেন। তখন তিনি ক্যান্সারে পরাস্ত প্রায়। আমাকে অনুরোধ জানালেন, আপনি একবার নিউইর্য়ক আসেন। আপনার সাথে অনেক কথা। তার সমস্ত প্রস্তাবনা শুনে আমি তাকে একটি ফাউন্ডেশন গঠন করে তার মাধ্যমে প্রস্তাবিত কাজসমূহ বাস্তবায়নের পরামর্শ দেই।
সেই অনুযায়ী, মৃত্যুর পূর্বে “কবি আলেয়া চৌধুরী ফাউন্ডেশন” এর কাগজপত্র তার নিয়োজিত এটর্নির নিকট সম্পাদন করে গেছেন। করোনা কালের জন্য এ কাজটি বাস্তবায়ন স্থগিত আছে আশাকরি করোনা কেটে গেলে ফাউন্ডেশনের কাজ বাস্তবায়িত হবে। ওনার মৃত্যুকালে ওনার সম্পত্তি ভাই বোনদের মাঝে দান করেছেন, আর বাকী সম্পত্তি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের জন্য দান করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি ৪ ভাই ২ বোন রেখে গেছেন। ঈষৎ পরিমার্জিত




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]