• প্রচ্ছদ » » জাফর ইকবাল : ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘স্টাইলিশ হিরো’


জাফর ইকবাল : ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘স্টাইলিশ হিরো’

আমাদের নতুন সময় : 26/09/2021

আলিম আল রাশিদ : সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’ এই গানটির কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে যায় সাদা প্যান্ট, সাদা সু ও সাদা টি শার্ট পরা এক তরুণ স্টাইলিশ কণ্ঠশিল্পীর কথা এবং তার চেয়েও বেশি মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন জনপ্রিয় নায়কের কথা। যিনি ওই গানটির গায়ক তিনি যতোটা না গায়ক হিসেবে মানুষের কাছে জনপ্রিয় তার চেয়ে বেশি সিনেমার নায়ক বা অভিনেতা হিসেবে আরও বেশি জনপ্রিয়।
অর্থাৎ যিনি গায়ক তিনিই নায়ক। তিনি আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবাল। যিনি ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে ফ্যাশন সচেতন ও স্টাইলিস্ট সুপার হিরো। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ে যারা নিজেদের উজ্জ্বলতায় আমাদের চলচ্চিত্রকে জগতকে উজ্জ্বল করেছেন তাদের অন্যতম একজন জাফর ইকবাল। জাফর ইকবাল বাংলাদেশের গানের কিংবদন্তী সুরকার আনোয়ার পারভেজের ছোট ভাই ও কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ’র বড় ভাই।
১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা জাফর ইকবালের শুরুটা গান দিয়ে। ভাই-বোনের মতো নিজেও গান গাইতে ভালোবাসতেন। তিনি ভালো গীটার বাজাতেন। সেই সময়কার বিখ্যাত গায়ক ‘এলভিস প্রিসলির’ দারুণ ভক্ত ছিলেন তাই তো চলনে-বলনে এলভিস প্রিসলিকে অনুকরণ করতেন জাফর ইকবাল। গানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ১৯৬৭ সালে বন্ধু তোতা, মাহমুদ ও ফারুককে নিয়ে গঠন করেছিলেন ব্যান্ড দল ‘র‌্যাম্বলিং স্টেনস’। সে সময়ে ব্যান্ড নিয়ে দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন জাফর ইকবাল।১৯৬৮ সালে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আইওলাইটস, উইন্ডিসাইট অব কেয়ার, লাইটনিংস এর সঙ্গে জাফর ইকবালের ব্যান্ড র‌্যাম্বলিং স্টোনস একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তৎকালীন ঢাকাই বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিশ নায়কদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাফর ইকবাল। তিনি যেমন ছিলেন স্টাইলিশ তেমন অভিমানী, আবেগপ্রবণ। ছিলেন বোহেমিয়ান। জাফর ইকবাল চিরসবুজ নায়ক হিসেবেই সবচেয়ে পরিচিত। শহুরে রোমান্টিক ও রাগী তরুণের ভূমিকায় দারুণ মানালেও সব ধরনের চরিত্রে ছিলো তার সহজ বিচরণ। অভিনয়ের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে চমৎকার গান গাইতে পারা এ অভিনেতা বেশকিছু ছবিতে গায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ঢাকার গুলশানের বাড়িতে জাফর ইকবালের ভাই-বোনদের সকলেরই গানবাজনার রেওয়াজ ছিলো। তার বোন শাহানাজ রহমতুল্লাহ একজন দক্ষ কণ্ঠশিল্পী। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজও নামকরা শিল্পী ও সুরকার।
১৯৮৪ সালে আনোয়ার পারভেজের সুরে রাজ্জাক অভিনীত বদনাম ছবিতে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম। মূলত তিনি ছিলেন একজন দক্ষ গিটারবাদক।ভালো গিটার বাজাতেন বলে সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাকে দিয়ে অনেক ছবির আবহসংগীত তৈরি করিয়েছেন। তার সেই ছবিগুলোও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে জাফর ইকবাল চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। তার অভিনীত প্রথম ছবির নাম ‘আপন পর’। এই ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন মিষ্টি মেয়ে কবরী। জাফর ইকবালের সঙ্গে অভিনেত্রী ববিতা জুটি হয়ে প্রায় ৩০টির মতো ছবি করে সুপার ডুপার হিট করে। সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ১৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জাফর ইকবাল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। চিত্রগ্রাহক ও চিত্রপরিচালক আবদুস সামাদ এর সূর্য গ্রহণ ও সূর্যসংগ্রাম এর সিকুয়েল চলচ্চিত্রে ববিতার বিপরীতে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। ১৯৭৫ সালে মাস্তান চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় তাকে সে প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নায়ক হিসেবে ঢাকাই চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের রাগী, রোমান্টিক, জীবন-যন্ত্রণায় পীড়িত কিংবা হতাশা থেকে বিপথগামী তরুণের চরিত্রে তিনি ছিলেন পরিচালকদের অন্যতম পছন্দ।সামাজিক প্রেমকাহিনী মাস্তান এর নায়ক জাফর ইকবাল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। নয়নের আলো চলচ্চিত্রে এক গ্রামীণ তরুণের চরিত্রেও দর্শক তাকে গ্রহণ করে।
১৯৮৯ সালে জাফর ইকবাল অভিনীত ত্রিভূজ প্রেমের ছবি অবুঝ হৃদয় দারুণ ব্যবসা সফল হয়। এ ছবিতে চম্পা ও ববিতার বিপরীতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। ববিতার সঙ্গে তার জুটি ছিলো দর্শকনন্দিত। এই জুটির বাস্তব জীবনে প্রেম চলছে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়েছিলো। তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় হতাশ হয়েই জাফর ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছিলো। প্রয়াত জাফর ইকবাল আড্ডার ছলে প্রায়ই ববিতাকে বলতেন, আমার ইচ্ছে আছে শাবনাজের বিপরীতে অভিনয় করব। জাফর ইকবালের সে ইচ্ছে অবশ্য পূর্ণ হয়নি। ববিতার বিপরীতে ৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি জুটি গড়ে তুলেন, যা দর্শক মহলে যথেষ্ট সমাদৃত হয় ও বক্স অফিস হিট করে। জাফর ইকবাল অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো, ‘ভাই বন্ধু’, ‘চোরের বউ’, ‘অবদান’, ‘সাধারণ মেয়ে’, ‘একই অঙ্গে এত রূপ’, ‘ফকির মজনুশাহ’, ‘দিনের পর দিন’, ‘বেদ্বীন’, ‘অংশীদার’, ‘মেঘবিজলী বাদল’, ‘সাত রাজার ধন’, ‘আশীর্বাদ’। এছাড়া তার অভিনীত, ‘অপমান’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘নয়নের আলো’, ‘গৃহলক্ষ্মী’, ‘ওগো বিদেশিনী’, ‘প্রেমিক’, ‘নবাব, প্রতিরোধ’, ‘ফুলের মালা’, ‘সিআইডি’, ‘মর্যাদা’, সন্ধি ইত্যাদি চলচ্চিত্র সুপারহিট হয়। জাফর ইকবাল ছিলেন আবেগপ্রবণ এবং দারুণ অভিমানী। জাফর ইকবালের ক্যারিয়ার যখন আকাশচুম্বী তখন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি। ১৯৯১ সালে ২৭ এপ্রিল মাত্র ৪০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন জাফর ইকবাল। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]