মরণোত্তর দেহদান প্রসঙ্গে

আমাদের নতুন সময় : 26/09/2021

নির্মলেন্দু গুণ : বিখ্যাত জনদের মরণোত্তর দেহদান নিয়ে মেডিকেল কলেজগুলো বিব্রত হন বলেই আমি জানি। একজনের মরদেহ মেডিকেল কলেজে দান করতে গিয়ে আমি কলেজ কর্তৃপক্ষের একজনের এরকম ভাষ্য শুনেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, কবি সাহেব বিখ্যাত মানুষদের মরদেহ নিয়ে আমাদের ছেলে মেয়েরা গবেষণা করতে চায় না। তারা অচেনা মানুষদের মরদেহ নিয়ে গবেষণা করতেই স্বস্তিবোধ করে। এটাই বাস্তবতা। আমাদের কলেজে বেশ কজন বিখ্যাত মানুষের দান করে যাওয়া মরদেহ পড়ে আছে। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কোনো গবেষণা কাজেই লাগছে না। তাদের মরদেহ সসম্মানে সংরক্ষণ করতে গিয়ে আমারা এখন নাজেহাল হচ্ছি। ধর্ম নির্দেশিত পন্থায় কবর ও শ্মশানের শেষকৃত্যানুষ্ঠান পরিহার করার জন্য অনেকে মেডিকেল কলেজগুলোকে টার্গেট করে মরণোত্তর দেহদান করে চলেছেন। গবেষণার কাজে লাগবে ভেবে তাঁরা যে ধারণাটিকে সত্যরূপ দিতে চাইছেন- তা রূঢ় বাস্তবতার নিরিখে সত্য নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওই কর্মকর্তার কথা শুনে আমি খুব অবাক হইনি। বেওয়ারিশ লাশ দাফন করতে গিয়ে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান যেখানে হিমশিম খাচ্ছে- সেখানে বিখ্যাতজনদের মরদেহ আমাদের কতোটা কাজে লাগবে- কেন কাজে লাগবে- এই প্রশ্নের সদুত্তর আমি দিতে পারিনি। ৫০০ বছর আগে যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা যখন খুব কম ছিলো- তখন লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো শিল্পী ও বিজ্ঞানীকে আমরা মরদেহের সন্ধানে কবরে কবরে ঘুরতে দেখেছি। এখন পৃথিবীর জনসংখ্যা যখন ৮০০ কোটির কাছাকাছি তখন করোনার কথা বাদ দিন, সড়ক-দুর্ঘটনায় পৃথিবীতে প্রতিদিন যে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে- বিশ্বের সবগুলো মেডিকেল কলেজ মিলেও তাদের একটা ক্ষুদ্র অংশকেও স্থান দিতে পরবে না। জাপানে আমার একজন বন্ধু আছেন, তিনি একটি মেডিকেল কলেজের মর্গে কাজ করেন। সড়ক দুর্ঘটনা ও আত্মহননকারী মানুষের বেওয়ারিশ লাশের হিসাব মিলাতে, মৃতের প্রতি সুবিচার করতে গিয়ে তাকে যে কী কষ্ট করতে হয়- সেকথা তিনি আমাকে দুঃখ করে বলেছিলেন। আগেও মনে হয়েছে, গুণী গায়ক, কবীর সুমনের মরণোত্তর দেহদানের খবরটি ফেইসবুকে পড়ার পর মনে হলো মরণোত্তর দেহদানের এই বিষয়টি নিয়ে কিছু বাস্তবকথা বলি। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১।
[২] অঙ্গদান চলুক, মরদেহদান বন্ধ হোক : কেউ কেউ বলছেন, মরণোত্তর অঙ্গদানের বিষয়টিকে আমি এড়িয়ে গিয়েছি। তা সত্য নয়। মৃতের চোখ, লিভার, ফুসফুস, অস্থি-মজ্জা- সবই বুঝলাম। কিন্তু মূল জিনিসটাই বুঝতে পারছি না- প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গ সংগ্রহ করার পর ওই মরদেহটির শেষ পরিণতি কী হবে- এই বিষয়টা স্পষ্ট করা দরকার। এই বিষয়টা এড়িয়ে চলার মতো সামান্য বিষয় নয়। তিনটি অপশন আমাদের আছে। [১] মৃতকে কবরে সমাহিত করা। [২] মৃতকে শ্মশানে চিতার আগুনে ভস্ম করে পঞ্চভূতে বিলীন করে দেয়া। [৩] ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বা ওসামা বিন লাদেনের মরদেহের মতো সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেয়া। এই তিনটের মধ্যে কোনো একটাকে আপনার বেছে নিতেই হবে। দেহদানপত্রে আপনার এই পছন্দের কথাটি জানাতে ভুলবেন না। তাতে আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় মরদেহ সংরক্ষণের চাপ বাড়বে। যারা মানবকল্যাণে মরদেহ দান করে যেতে চান- তাদের বিষয়টি এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যে, মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কখনও এমনটি মনে না হয়- যে, মেডিকেল কলেজের ডেডবডি সেকশনে মৃত্যুর পরও বিনা-ভাড়ায় থাকিয়া যাইবার এই ব্যবস্থাটা তো মন্দ নয়।
[৩] কার্যকর থাকা অবস্থায় মৃতের কোনো অঙ্গ যদি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়- সেই অপশনটাকে আমি অন্তর থেকে স্বাগত জানাই। প্রশ্ন হলো অতঃপর কিম্? এরপর কী হবে? রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে মারা গেলে তাঁর হৃদপিন্ডটি কেটে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে পাঠানো হয় এবং দ্বারকানাথের হৃদপিন্ডহীন মরদেহটিকে লন্ডনের নিকটবর্তী কেনসাল গ্রীন সিমেট্রিতে (খ্রিস্টানদের জন্য বানানো ) সমাহিত করা হয়। সেই কবর আমি আবিষ্কার করে দেখে এসেছি। যারা অঙ্গদানের মাধ্যমে মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখতে চান, তাদের আমি স্বাগত জানাই। কিন্তু কার্যকর অঙ্গটিকে (চোখ, দাঁত, লিভার, ফুসফুস ইত্যাদি) মরদেহ থেকে পৃথক করার পর ওই মরদেহটির শেষকৃত্য করার ব্যবস্থা পারিবারিকভাবে বা পরিবার শেষকৃত্য করার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলে- রাষ্ট্র বা আঞ্জুমানে মফিদুল টাইপের সংগঠনগুলির উদ্যোগে ওইসব মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। অঙ্গ সংস্থাপনের নামে অপ্রয়োজনীয় মরদেহ সসম্মানে সংরক্ষণ করার দায় আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোর ওপর আমরা চাপিয়ে দিতে পারি না। এরকমটি হলে- তা হবে উটের সঙ্গে বিড়াল বিক্রির সেই লোকঠকানো ঘটনাটির মতো। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]