• প্রচ্ছদ » » সাতচল্লিশ বছর আগেই বঙ্গবন্ধু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাঁচতে হবে আত্মমর্যাদা নিয়ে এবং মাথা উঁচু করে


সাতচল্লিশ বছর আগেই বঙ্গবন্ধু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাঁচতে হবে আত্মমর্যাদা নিয়ে এবং মাথা উঁচু করে

আমাদের নতুন সময় : 26/09/2021

প্রভাষ আমিন: বঙ্গবন্ধুর অনেক বিখ্যাত ভাষণ আছে। সবচেয়ে বিখ্যাত নিশ্চয়ই একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণ। যে ভাষণে তিনি একটি জাতির হৃদয়ে মুক্তির স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে একটি শিশু রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে মাতৃভাষায় দেওয়া তার সেই ভাষণটি গোটা বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায়, বিশ্ব শান্তি আর মানবতার জয়গান গাওয়ার এক সাহসী উচ্চারণ হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে ইতিহাসে। শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন বঙ্গবন্ধু থেকে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্ব মানবতার নেতায়। আলজেরিয়া, গিনি বিসাউ, ভিয়েতনাম, ফিলিস্তিন, জাম্বিয়া, নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন, ‘চূড়ান্ত বিজয়ের ইতিহাস জনগণের পক্ষেই থাকে।’
১৯৭৪ সালের প্রতিকূল পরিবেশে বাংলাদেশের তখন টিকে থাকার সংগ্রাম। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুর্নগঠনের সংগ্রাম তো আছেই, আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ। আর আছে, বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোর ভ্রুকুটি। বঙ্গবন্ধু সব উঁড়িয়ে দিলেন এক লহমায়। এক ভাষণেই তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষাকে চিনিয়ে দিলেন বিশ্বকে। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু নিজেদের ভাষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ভুলে যাইনি।বিশ্বকে সবচেয়ে বড় যে বার্তাটি তিনি দিলেন, তা হলো আত্মমর্যাদার। সেটা শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের ছোট ছোট দেশগুলোর। তিনি সবাইকে সাহস দিলেন, ন্যায্যতা নিয়ে, মর্যাদা নিয়ে রুখে দাঁড়ালে বিজয় অবশ্যম্ভাবী। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণ শুরুই করলেন,‘আজ এই মহা মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্ম নিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাক্সিক্ষত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লাখ লাখ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সাথে শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবে।’এতো বছর পর বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণটি পড়তে গিয়েও বারবার শিহরিত হচ্ছি। শুরুতেই যেমন বলেছি, আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধকে মহিমান্বিত করেন বঙ্গবন্ধু অল্প কথায়, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম হইতেছে সার্বিক অর্থে শান্তি এবং ন্যায়ের সংগ্রাম। আর সেজন্যই জন্মলগ্ন হয়েতেই বাংলাদেশ বিশ্বের নিপীড়িত জনতার পাশ্বে দাঁড়িয়ে আসছে।’ বঙ্গবন্ধুর কথায় বাংলাদেশ আর নিছক একটি ছোট্ট রাষ্ট্র নয়, বিশ্ব শান্তি আর ন্যায়ের প্রতীক হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শুধু বলে ক্ষান্ত হননি, পথ দেখিয়েছেন জাতিসংঘকেও, ‘একদিকে অতীতের অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটাতে হচ্ছে, অপরদিকে আমরা আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বেছে নিবে, তা নিয়ে সংকটে পড়েছে। এই পথ বেছে নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করতে আমরা সামগ্রিক ধ্বংসের ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়ে এবং ক্ষুধা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কশাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়িয়ে তুলে এগিয়ে যাবো অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাবো বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করে তুলবো। আমরা এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন যে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট শুধুমাত্র শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতার পরিবেশেই সমাধাণ করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ যে, বর্তমান অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করার জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধুমাত্র এ ধরনের পরিবেশই সৃষ্টি হবে না, এটাতে অস্ত্র সজ্জার জন্য যে বিপুল সম্পদ অপচয় হচ্ছে, তাও মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করা যাবে।’৪৭ বছর আগের বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা এখনও সমান প্রাসঙ্গিক।
বঙ্গবন্ধু অল্প কথায় স্পষ্ট করেছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও, ‘শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী সকল দেশের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক বজায় রাখিবে। আমাদের অঞ্চলে এবং বিশ্বশান্তির অন্বেষার সকল উদ্যোগের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’আমি মুগ্ধ হয়ে যাই, যখন বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘মানুষের অজয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস, মানুষের অসম্ভবকে জয় করার ক্ষমতা এবং অজেয়কে জয় করার শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রাখিয়া আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতে চাই’। আমাদের মতো যেসব দেশ সংগ্রাম ও আত্মদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, এ বিশ্বাস তাদের দৃঢ।
আমরা দুঃখ ভোগ করতে পারি কিন্তু মরবো না। টিকিয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে জনগণের দৃঢতাই চরম শক্তি।আমাদের লক্ষ্য স্ব-নির্ভরতা। আমাদের পথ হচ্ছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও যৌথ প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ ও প্রযুক্তি বিদ্যার শরিকানা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস করবে এবং আমাদের কর্মকাণ্ডকেও সহজতর করবে, এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন বিশ্বের অভ্যুদয় ঘটছে। আমাদের নিজেদের শক্তির উপর আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। আর লক্ষ্য পূরণ এবং সুন্দর ভাবীকালের জন্য আমাদের নিজেদের গড়ে তুলার জন্য জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যাবো।
বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন জাতিসংঘে, মানুষের-মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন দেশে-বিদেশে তার অনেকটাই এখনো পূরণ হয়নি। কিন্তু যে স্বপ্নের কথা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, বিশ্ব মানবতার পথ সেটিই। আমরা জাতি হিসেবে সৌভাগ্যবান, আমাদের একজন বঙ্গবন্ধু ছিলেন, যিনি শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, বিশ্বের মানুষের মুক্তির দূত। ৪৭ বছর আগেই যিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমাদের ধ্বংস করা যাবে না, মানুষকে ধ্বংস করা যায় না। বাঁচতে হবে আত্মমর্যাদা নিয়ে, মাথা উঁচু করে। হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]