তখন সত্যি লেখক ছিলাম!

আমাদের নতুন সময় : 20/10/2021

জাকির তালুকদার : তখন সত্যি লেখক ছিলাম। বেশি মানুষ আমার লেখালেখির খবর জানত না। পত্র-পত্রিকা লেখা চাইত না। তখন রোগী দেখতাম, ঘুরতাম, যেকোনো জায়গাতে মানুষের জটলা দেখলে বসে পড়তাম। অপরিচিত বলে প্রথমে একটু সংকুচিত থাকলেও তা কেটে যেতে সময় লাগত না বেশি। আর ছিল বই পড়া। ভালো লিটল ম্যাগাজিনগুলো আদ্যোপান্ত পড়তাম একাধিকবার। ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব পড়তাম। একাকি সব ভেদ বোঝা সম্ভব হতো না সবসময়। না বুঝলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নিশ্চুপে মগজকে তার কাজ করতে দিতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সবচেয়ে বেশি পড়তাম কবিতা।
গল্প লিখতাম সবটুকু মনোযোগ নিবেদন করে। প্রতিটি শব্দ বাছবিচার করতে পারতাম। গল্প শেষ হলে ফেলে রাখতাম দিনের পর দিন। কোথাও পাঠানোর তাড়া-তাগাদা ছিল না। লিখে শেষ করা গল্পের কোনো অংশ নিয়ে মন খুঁতখুঁত করলে আবার নতুন করে লিখতাম। মিলিয়ে দেখতাম কোনটা যুতসই। আগের লেখাটুকু না পরের সংশোধনীটুকু? চিঠি লিখতাম। আহ চিঠি! চিঠি লিখতাম, চিঠি পেতাম।
ছুটির দিনে যে কোনো একদিকে ছুটে যাওয়া। কাছাকাছি কোনো শহরে বা গ্রামে। সমবয়সী কবির বাড়িতে। বিনা নোটিশে। কিন্তু জুটত অসম্ভব আন্তরিক অভ্যর্থনা। যার কাছে গেছি, সেই বন্ধুও নিজের সব কাজ বাদ দিয়ে গল্প করতে বসে যেতো। গল্প মানে লেখার গল্প, লেখকের গল্প। শামসুর রাহমান থেকে জাহিদ হায়দার, হাসান থেকে মামুন হুসাইন, যার বই বেরিয়েছে তাকে নিয়েই গল্প-আলোচনা। খেতে খেতে গল্প, খাওয়ার পরে ভাত-গড়ানির সময় গল্প, বিকালে এলাকা ঘুরতে ঘুরতে গল্প, রাতের খাওয়ার পরেও গভীর রাত পর্যন্ত গল্প। মাঝে তার নতুন লেখা পাঠ, আমি শ্রোতা। আমার নতুন লেখা পাঠ, সে শ্রোতা। এভাবেই আমার আস্তানাতেও হঠাৎ হঠাৎ চলে আসত কেউ। কাউকে নিন্দা করতে তখন শিখিনি আমরা। শুধু মুগ্ধ হতেই শিখেছি তখন। এখন যারা বয়স্ক মুরুব্বি কবি বা লেখক, অনেকেই তেমন প্রসিদ্ধি পাননি, তাদের প্রথম বইয়ের নাম আমি যখন বলে দিতে পারি, অনেকেরই চোখ ছলছল করে ওঠেÑ তুমি জানো? কীভাবে জানো? কীভাবে মনে রেখেছ? সেই সময়ের কথা বলি। যখন যেকোনো গ্রন্থের জনক আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ লেখক বা কবি। তাই মনের মধ্যে খোদাই করা আছে সব নাম। তখন তো কে গৌণকবি কে বড় লেখক, তা বিচার করার সময় ছিল না। তখন সবার আমি ছাত্র।
সেই সময় যে গল্পগুলো লিখেছি, সেগুলোতে নিজের আত্মাকে কুচি কুচি করে ছড়িয়ে দিতাম। এখনও দিই। কিন্তু তখনকার মতো একটি নতুন লেখা নিয়ে বিভোর হয়ে থাকার সুযোগ নেই। লেখা শেষ হবার সাথে সাথেই পাঠিয়ে দিতে হয়। কারণ কেউ গল্প চেয়ে রেখেছেন এক বছর আগে। কেউ ছয়মাস আগে। যখন কেউ আমার গল্প চাইত না, তখনই ছিল প্রাণভরে গল্প লেখার সুযোগ। তাই আবার হতে চাই অচেনা লেখক। লেখক : কথাসাহিত্যিক। তধশরৎ ঞধষঁশফবৎ-র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]