নোবেল পুরস্কার : জানা অজানা

আমাদের নতুন সময় : 20/10/2021

খালিদ খলিল

নরওয়ের অসলোয় প্রতি বছর অক্টোবর মাস এলেই যেন শুরু হয় ‘নোবেল মৌসুম’। কেননা এ মাসেই বছরের নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করা হয়। শত বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বসেরা মানবিক অর্জনের স্বীকৃতি দিয়ে আসছে নোবেল পুরস্কার কমিটি। প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেলের শেষ ইচ্ছাপত্র (উইল) অনুসারে, সেই ব্যক্তিই নোবেল পুরস্কারের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন, ‘যিনি জাতিগত সৌহার্দ রক্ষা, সামরিক শক্তি হ্রাস ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বোত্তম ভূমিকা রাখবেন’। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের উৎস ও আলফ্রেড নোবেলের জীবনীর খোঁজে নামলে দেখা যাবে ভিন্ন চিত্র।
আলফ্রেড নোবেলের বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। আর্থিক অনটনের কারণে দেউলিয়া ঘোষিত হলে তিনি এক সময় সুইডেন ছেড়ে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গে আশ্রয় নেন। সেখানে সমুদ্রে নিমজ্জিত বিস্ফোরক মাইন উদ্ভাবনের মাধ্যমে রাশিয়ার জার শাসকদের সুনজরে পড়েন। ‘টর্পেডো’ মাইন তৈরির ওপরও তিনি কাজ শুরু করেন। ১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন আলফ্রেড নোবেল। নোবেলের কবিতায় আগ্রহ থাকলেও বাবা রসায়ন ও প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। প্যারিসে পড়াশোনার সময়ই ইতালিয়ান রসায়নবিদ অ্যাসকানিও সোব্রেরোর সঙ্গে নোবেলের পরিচয় হয়। এই অ্যাসকানিও ১৮৪৭ সালে আবিষ্কার করেন ‘নাইট্রো গি�সারিন’। সালফিউরিক ও নাইট্রিক এসিডের সঙ্গে গ্লিসারিন মিশিয়ে এই তরল বিস্ফোরক উৎপাদন করা হয়। নাইট্রো গ্লিসারিন থেকে বিপদের আশঙ্কা জানার পরও নোবেল পরিবার এর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে অনুসন্ধানে নেমে পড়ে।
১৮৬৭ সালে নোবেলের ছোট ভাই এমিল ও আরো কয়েকজন ব্যক্তি নাইট্রোগি�সারিন নিয়ে গবেষণা করার সময় সুইডেনে তাদের কারখানায় নিহত হন। কিন্তু ভাইয়ের মৃত্যুতে নোবেল এই প্রকল্প বাদ না দিয়ে বরং আরো উৎসাহের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যান। এক বছর পর জার্মানিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলফ্রেড নোবেল অ্যান্ড কোম্পানি’। সেখানে কারখানায় নাইট্রো গ্লিসারিনের সঙ্গে ‘গান পাউডার’ (বারুদ) মিশিয়ে উৎপাদন করলেন ‘বস্নাস্টার অয়েল’। সেটা নিয়েও ঘটল আরো কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোতেও একটি গুদামে বস্নাস্টার অয়েল বিস্ফোরণে নিহত হন ১৫ জন। অবশেষে ১৮৬৭ সালে আলফ্রেড নোবেল আবিষ্কার করলেন, নাইট্রো গ্লিসারিনের সঙ্গে ডায়াটোমেসিয়াস চূর্ণ মিশিয়ে ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক উৎপাদন সম্ভব। গ্রিক শব্দ ‘দুনামিস’ (যার অর্থ ক্ষমতা) অনুসরণে তিনি তার নতুন আবিষ্কৃত এই বিস্ফোরকের নাম দিলেন ‘ডিনামাইট’।
স্থাপনা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য নোবেলের ডিনামাইট আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক। আর সেই সুবাদেই তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। কিন্তু নোবেলের এই আবিষ্কারের খবর সামরিক কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল না। আর তাই তৎকালীন যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ মারণাস্ত্র হিসেবে এর ব্যবহার শুরু হয়। তবে সামরিক খাতে ডিনামাইটের ব্যবহারের বিরুদ্ধে তার কোনো মতামত পাওয়া যায় না।
সুইডেনের অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘বোফোর্সের’ মালিক ছিলেন আলফ্রেড নোবেল। এটি আগে লোহা ও স্টিল উৎপাদন করলেও নোবেলই একে কামান ও অন্যান্য যুদ্ধ-উপকরণ প্রস্তুতে ব্যবহার শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি উদ্ভাবন করেন ডিনামাইটের চেয়েও অধিক স্থিতিশীল ও শক্তিশালী বিস্ফোরক ‘জেলিগনাইট’। ১৮৮৭ সালে তিনি ধোঁয়াবিহীন পাউডার বিস্ফোরক ‘ব্যালিস্টাইটের’ পেটেন্ট লাভ করেন, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন সেনাবাহিনীর রাইফেলের কার্তুজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নোবেলের দুই ভাই লাডভিগ ও রবার্ট কাসপিয়ান সাগরের তেলক্ষেত্র থেকে অগাধ সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। আলফ্রেড নোবেলও সেখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভবান হন। নোবেলকে অনেকে ‘শান্তিবাদী’ হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করলেও জীবদ্দশায় তার মালিকানাধীন ৯০টি অস্ত্রের কারখানা কিন্তু বলে ভিন্ন কথা।
১৮৮৮ সালে নোবেলের ভাই লাডভিগ মারা গেলে অনেক সংবাদমাধ্যম ভুল করে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু হয়েছে ভেবে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখনই নোবেল বুঝতে পারেন, তার আবিষ্কার বিশ্বের বিবেকবান মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। একটি ফরাসি পত্রিকায় তাকে নিয়ে লেখা হয় ‘মৃত্যুর সওদাগরের মৃত্যু’। সেখানে নোবেলকে উল্লেখ করা হয় একজন মানুষ হিসেবে, ‘যিনি মানুষ হত্যার ত্বরিত উপায় উদ্ভাবনের মাধ্যমে হয়েছেন সম্পদশালী’।
এসব প্রতিবেদন দেখে স্তব্ধ হয়ে যান নোবেল। এরপর তিনি স্থির করেন, বদনাম ঘোচাতে বিশেষ কিছু করতে হবে। আর তাই মৃত্যুর এক বছর আগে ১৮৯৫ সালে তিনি তার অর্থ নোবেল পুরস্কারের জন্য উৎসর্গ করে যান। তার রেখে যাওয়া অর্থের লভ্যাংশ থেকেই পুরস্কার দেয়া হয়। উল্লেখ্য, নেবেল ছিলেন অবিবাহিত। যদিও রাশিয়ার নারী আলেক্সান্দ্রা, অস্ট্রো-বোহেমিয়ান নারী বার্থা কিনস্কি এবং ভিয়েনার নারী সোফি হেসের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
?নোবেল পুরস্কারের অজানা তথ্যÑএক. অনেকের ধারণা, একজন মানুষ কেবল একবারই নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। ধারণাটি ভুল। নোবেল পুরস্কারে এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। আমেরিকান বিজ্ঞানী জন বারডিন পদার্থে দুইবার (১৯৫৬ ও ১৯৭২ সালে) নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তেমনি ব্রিটিশ জৈব-রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ স্যাঙ্গারও দুইবার রসায়নে নোবেল পেয়েছেন।দুই. একজন মানুষ একাধিক বিভাগেও নোবেল পেতে পারেন। ফ্রান্সের ম্যারি কুরি ১৯০৩ সালে পদার্থে ও ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তিন. নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে একটি মজার তথ্য হলোথ ১৯৩৯ সালে জার্মান একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারকেও নোবেলের জন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন সুইডিশ পার্লামেন্ট সদস্য ইজিসি ব্রান্ডট। অবশ্য পরে তিনি তা প্রত্যাহার করেন। চার. এ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৯৫ ভাগই পুরুষ। তবে বিচারকদের দাবি, তারা প্রার্থী বাছাইয়ের সময় কখনই লিঙ্গ বিবেচনায় নেন না। অতীতের গবেষণাক্ষেত্র মূলত পুরুষ-প্রাবাল্যই এর কারণ। পাঁচ. শুরুতে অর্থনীতি বিভাগে নোবেলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আলফ্রেড নোবেলের উইলে পুরস্কারের পাঁচটি বিভাগের (চিকিৎসা বা শারীরবিদ্যা, পদার্থ, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তি) কথা উল্লেখ ছিল। তবে ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলফ্রেড নোবেলের সম্মানে এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করে। তাই প্রায়োগিক বিচারে এটি নোবেল পুরস্কার নয়।
ছয়. সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই (১৭ বছর)। আর সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পেয়েছেন পোলিশ অর্থনীতিবিদ ও গণিতবিদ লিওনিড হুরউইকজ (৯০ বছর বয়সে)। ২০০৭ সালে যৌথভাবে তিনি এই পুরস্কার পান।
সাত. নোবেল পুরস্কারে মনোনীত হয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জ্যাঁ পল সার্তে ও লে দুক থো।
আট. ১৯৭৪ সালে ‘নোবেল ফাউন্ডেশন’ মরণোত্তর নোবেল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে মাত্র দুইবার মরণোত্তর নোবেল দেয়া হয়েছে। ১৯৬১ সালে শান্তিতে দাগ হ্যামারসোল্ড এবং ১৯৩১ সালে সাহিত্যে মরণোত্তর নোবেল পেয়েছিলেন এরিক অ্যালেক্স কার্লফেল্ডট। নয়. বর্তমানে প্রতিটি বিভাগে নোবেল পুরস্কার হিসেবে ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার দেয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক প্রার্থী হলে এই অর্থ ভাগ হয়ে যায়।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]