• প্রচ্ছদ » » অজ্ঞতা জয় করে মানুষ এগিয়ে যাক প্রজ্ঞার শক্তিতে


অজ্ঞতা জয় করে মানুষ এগিয়ে যাক প্রজ্ঞার শক্তিতে

আমাদের নতুন সময় : 23/10/2021

এম আমির হোসেন

সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে কেবল রক্ত ঝরছে। হয় তারা নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করছে নতুবা অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এর মূল কারণ ইসলাম নয়, বরং ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ চর্চাই মূলত দায়ী। ইসলামের সূচনাপর্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এতো বহুধাবিভক্তি ছিলো না। গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুই নির্ধারিত হতো পলিটিক্স দ্বারা। সাধারণ মানুষ ছিলো একেবারেই সাধারণ এবং ঐতিহাসিকমূল্যেও গুরুত্বহীন। তথাকথিত এলিট শ্রেণির পলিটিক্যাল কর্মকাণ্ডই ছিলো সব। সেই সময়ে ইসলামের বিস্তারের জন্য পলিটিক্যাল ইসলামের প্রয়োজন ছিলো। তাই ইসলামের ফিলোসোফিক্যাল চর্চা তখন অতটা দৃশ্যমান হয়নি বা হলেও তা আলোচনায় আসেনি। একটি রাষ্ট্র বা সমাজ বা গোষ্ঠীর শাসক নির্বাচিত হওয়া ও শাসন-ক্ষমতা ধরে রাখার পদ্ধতির নাম হলো পলিটিক্স। রাজনীতি তথা পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট ছাড়া ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করা যায় না। আঠারো/উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত পলিটিক্সের মূল উপাদান ছিলো ধর্মকেন্দ্রিক নানাবিধ ভাববাদী চিন্তাচেতনা। ধর্মীয় নীতির সাহায্যে ধর্মপ্রধানেরাই মূলত রাজ্য শাসন করতো নতুবা শাসকদের নিয়ন্ত্রণ করতো। অনুরূপ রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মও বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করেছিলো। এরপর বিশ্বজুড়ে ধীরে ধীরে বস্তুবাদী চিন্তাচেতনার বিকাশ হতে শুরু করে। পলিটিক্সও বস্তুবাদী চিন্তা দিয়ে প্রভাবিত হয়। এর ফলে তা ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও ধর্মনেতাদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। সর্বশেষে উসমানী খিলাফতের পতন হলেও ইসলাম পরিবর্তিত এই বস্তুবাদী ধারাটির সঙ্গে ঠিক অভিযোজন করতে পারেনি। তারা ইসলামের পূর্বের ধারাটি এখনো বহাল রাখতে চায়। ফলশ্রুতিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ট্রেন্ড থেকে তারা পিছিয়ে পড়ে। দ্বন্দ্বটা শুরু হয় এখান থেকেই।
পক্ষান্তরে ফিলোসোফিক্যাল ইসলাম হলো কমপ্লিট ‘প্যাকেজ অব লাইফ’ জন্ম, কর্ম, শিক্ষা, বিয়ে, উৎসব, সমাজ, সম্পত্তি বণ্টন, মৃত্যু, এমনকি মৃত্যু-পরবর্তী জীবনসহ সব কিছুর পরিপূর্ণ প্যাকেজ। ধর্ম হলো ব্যক্তির নির্ভরতার জায়গা, সংস্কৃতি, আইডিওলজিক্যাল শেল্টার, প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট অশান্তি ও অপূর্ণতার সান্ত্বনা, নির্ভার হয়ে এলিয়ে পড়ার বিছানা, নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণকারী, পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হওয়ার মোটিভেশান, ত্যাগ ও মানবকল্যাণে উৎসাহদান, আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সম্পর্ক। ফিলোসোফিক্যাল সেই ইসলামের কোনো বিকল্প কি আছে ইসলাম অনুসারীদের? সুফিবাদ ফিলোসোফিক্যাল ইসলামের সেই চর্চাটিই করেছে। পলিটিক্যাল ইসলামের সঙ্গে ফিলোসোফিক্যাল এই ইসলামকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এই দুটির মধ্যকার পার্থক্য মুসলিমরা যতো দ্রুত অনুধাবন করতে পারবেন তাদের জন্য ততোই মঙ্গল। যেকোনো মতাদর্শকে পলিটিক্যালাইজ করা যায়। এটা নির্ভর করে মতাদর্শের ব্যাখ্যার ওপর। ধর্ম পরিমাণগত নয়, গুণগত একটি মতাদর্শ যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত করেও দেওয়া সম্ভব। কী উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে সেটাই মূল বিবেচ্য। পলিটিক্যাল প্রয়োজনে ব্যাখ্যা দিলে তা ফিলোসোফিক্যাল ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতেও পারে। পলিটিক্যাল প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথকে যদি কেউ ধর্মপ্রণেতা বানায় তবে তাঁর ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানের মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব, বায়ুর গতিপ্রবাহ ইত্যাদি হাস্যকর যুক্তিও কেউ কেউ খুঁজে পাবেন!
পূর্বে ক্ষমতার সঙ্গে ধর্মের সংযোগ ছিলো গাঢ়। বর্তমানে বস্তুবাদী চিন্তাচেতনা বিকশিত হওয়ায় নতুন বিধিবিধান, আইন তৈরি হয়েছে। বিশ্ব হেটারোজেনাস। সবাই কখনো এক-ধর্ম, এক-জাতি, এক-সংস্কৃতি, এক-ভাষা বা এক-বিশ্বাসের হবে না। সারা বিশ্বকে মুসলিমদের পদানত করা বা সবাইকে মুসলিম বানিয়ে ফেলা পলিটিক্যাল ইসলামের চিন্তা। ইসলামের স্বর্ণযুগেই তো সবাই মুসলিম হয়নি। এখন কী করে হবে? বরং সবার সঙ্গে সহাবস্থান তৈরি করাই এখন মূল বিষয়। ইসলাম ইনক্লুসিভ ধর্ম, ইসলাম ইব্রাহিম, মুসা, ঈসাসহ সবাইকেই নবী হিসেবে মানে যেখানে খ্রিস্ট ধর্ম বা ইহুদি ধর্ম মুসলিমদের নবিসহ অনেক নবিকেই মানে না। ইসলাম যে ‘ইনক্লুসিভ ধর্ম’ এই কথা কখনো পলিটিক্যাল ইসলামিস্টরা প্রচার করে না। আসলে ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ কোনো ধর্ম নয়, ক্ষমতাদখলের রাজনৈতিক মতবাদ মাত্র, যেখানে ধর্মকেই এক্সপ্লয়েট করা হয়। এই মতবাদ পূর্বে কার্যকর হলেও বর্তমানে তা একেবারেই অকার্যকর। আর অত্র অঞ্চলে কেবল মুসলিম শাসকদের কারণে ইসলাম প্রচার হয়েছে তা পুরোপুরি সত্য নয়। মুসলিম শাসকরা যখন সাত/আটশো বছর এখানে শাসন করেছিলো তখন মুসলিমরা ছিলো সংখ্যালঘু। একটি রেফারেন্স দিচ্ছি এই যুক্তবঙ্গ অঞ্চলের। সেনসাস অফ ইন্ডিয়া ১৮৭১ সালের হিসাবে মুসলিম ছিলো ১৭৬ লাখ এবং হিন্দু ছিলো ১৮১ লাখ। কিন্তু ১৮৯১ সালে মুসলিম হয় ১৯৫৮২৩৪৯ জন, হিন্দু ১৮০৬৮৬৫৫ জন। তখন কিন্তু ব্রিটিশ আমল ছিলো। এর মানে যুক্তবঙ্গে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে ব্রিটিশ আমলে, মুসলিম আমলে নয়। এর কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। মুসলিমরা পলিটিক্যাল ইসলামের মোহ থেকে মুক্ত হতে না পারলে এই অমানিশা সহজে ঘুচবে না। বৈচিত্র্যের মধ্যেই সৌন্দর্য খুঁজে নিতে হবে। আর তা ফিলোসোফিক্যাল ইসলামের চর্চার মাধ্যমে আসবে। ধর্মকে কেবল প্রথা আর আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞানচর্চার দর্শন হিসেবেও চর্চা করতে হবে। পাশাপাশি বস্তুবাদী জ্ঞান-বিজ্ঞানেও উন্নতি লাভ করতে হবে। তবেই আসবে মানবতার আকাক্সিক্ষত মুক্তি। পলিটিক্যাল ইসলামের চর্চা বন্ধ করতে হলে আগে এর পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সাংবিধানিকভাবে বন্ধ করা জরুরি।
শুধু ইসলাম নয়, সকল ধর্মের ধার্মিকদের মনে রাখতে হবে, পলিটিক্যাল রিলিজিয়নের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন ধর্মকে টিকে থাকতে হবে তার ফিলোসোফিক্যাল শক্তিতে। এটা ধর্ম ও মানবসভ্যতা উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য বরং এতেই সাধিত হবে। রাষ্ট্র চলবে বস্তুবাদী নিয়মকানুন ও আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুগোপযোগী হবে, পরিবর্তন ও পরিমার্জন হবে। মানুষের বিকাশ ও ইতিহাসের গতি ঠেকিয়ে রাখতে চাওয়ার মতো মূর্খতা আর দ্বিতীয়টি নেই। এই মূর্খতার শিকার হয়ে আর কতোকাল নিষ্পাপ রক্ত ঝরবে? মানুষ তার মূর্খতাকে জয় করে এগিয়ে যাক প্রজ্ঞার শক্তিতে, এটাই প্রত্যাশা আমার। লেখক : চিকিৎসক

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]