• প্রচ্ছদ » » এই আওয়ামী লীগ আর সেই আওয়ামী লীগ নেই!


এই আওয়ামী লীগ আর সেই আওয়ামী লীগ নেই!

আমাদের নতুন সময় : 23/10/2021

মঞ্জুরে খোদা টরিক

টিএসসির মোড়ে রাজু ভাস্কর্য নির্মাণের সময় এই জায়গাটির অনুমোদনের বিষয় ছিলো। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা। সুতরাং এটা তাদের বিষয়। সে সময় আমরা ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে রাজু ভাস্কর্য নির্মাণের অনুমোদনের জন্য। তিনি বললেন, এই রাস্তাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দিয়ে গেলেও তা সিটি কর্পোরেশনের অধীন। অতএব তোমাদের সিটি অফিস থেকে অনুমতি নিতে হবে। তখন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ হানিফ। আমরা উনার কাছে গেলাম রাজু ভাস্কর্য নির্মানের স্থানটির অনুমোদনের জন্য। কিন্তু তিনি আমাদের এ স্থানের অনুমতি না দিয়ে বললেন, এভাবে এখানে রাস্তার মাঝে মূর্তি-টুর্তি বানানো যাবে না। এখন আপনার কী করবেন, না করবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার। তিনি আমাদের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিলেন না। পরে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে বিষয়টি জানিয়ে মেয়রের অনুমতি ছাড়াই টিএসসিতে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকা ‘সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য’ নির্মাণ করি।
যে কারণে এই কাহিনির অবতারণা করছি, পত্রিকায় দেখলাম আওয়ামী নেতা তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, তিনি সংসদে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব তুলবেন এবং ৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে দেশকে অনুসরণ করার কথা বলবেন। এ কথার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা ও ধর্মত্যাগের সাথে তুলনা করেছেন। কোনো মুসলমান ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতে পাবেন না। তাহলে বঙ্গবন্ধু কি ধর্মত্যাগ করেছিলেন, নাস্তিক ছিলেন, উনাকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিলো? তাহলে কীভাবে তিনি বলেন, ডা. মুরাদ হাসানের সেটা করলে তার মন্ত্রিত্ব থাকবে না, এমনকি তিনি দেশেও থাকতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেন। ‘তাহলে শেখ মুজিব কি মুসলমান ছিলেন না? এ কথার মাধ্যমে- তিনি কি প্রকারন্তরে বঙ্গবন্ধুর ধর্মবিশ্বাস নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন না’?
আওয়ামী লীগের বর্তমান ঘোষণাতেও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে। এটা তো সংগঠনের ঘোষণা ও শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্যও। তার মানে তিনি কি আওয়ামী লীগের ঘোষণাও মানেন না? দলের মূলনীতি বিরোধী বক্তব্য দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তিনি থাকেন কী করে? মি. খোকনের বক্তব্য শোনার পর তাঁর পিতার কথা মনে পড়ে গেলো, যিনি আমাদের ভাস্কর্য নির্মাণের স্থানের অনুমোদনের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ছেলের বক্তব্য শুনে মনে হলো, তিনি সে পথই অনুসরণ করছেন। কিন্তু উনারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে দাবি করেন! বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ কি ছিল? ধর্মনিপেক্ষতা কি বঙ্গবন্ধুর নীতি ছিলো না? তিনি কি তাহলে ভুল রাজনীতি করেছেন? বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে তিনি অসংখ্যবার বলেছেন, যার জন্য জীবন দিয়েছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি, পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর রেসকোর্সের ভাষণে বলেছেন, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি কোনো বিশেষ ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বলেন, ‘জনাব স্পিকার সাহেব, ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবোও না। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের কারও নেই। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। .. ২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যাভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বলেন, রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক, তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে, সে কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না…।
বঙ্গবন্ধুর দু’টি দিক। একটি হচ্ছে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু অন্যটি হচ্ছে আদর্শের। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ডে ছিলেন। তারা শুধু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকেই খুন করেননি, ইতিহাসের গতিমুখকেও ঘুরিয়ে দিয়েছেন। সাঈদ খোকনারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে দাবি করেন, কিন্তু তারাই তাঁকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করছেন, অস্বীকার করছেন। তাঁর রাজনীতির বিকৃত-বিপরীত ব্যাখ্যা করছেন। বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শের সৈনিকই আওয়ামী লীগের টিকিটে মেয়র হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন, মাইনাস টু ফর্মূলার সমর্থক ও ১/১১ সরকারের কিংস পার্টিতে যোগদান করা নেতা। বর্তমান মেয়র শেখ তাপস তারই দলের নেতা তার বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন। তারাই বর্তমান আওয়ামী লীগকে ঘিরে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির বিপরীতে থাকা তারাই মুরাদ হাসানদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, দেশত্যাগের কথা বলেন! কিন্তু দল থাকে নিরব-নিরুত্তাপ ও প্রতিবাদহীন। লেখক ও গবেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]