• প্রচ্ছদ » » বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুঃখ!


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুঃখ!

আমাদের নতুন সময় : 28/10/2021

আকতার বানু আল্পনা

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা বিরাট দুঃখ আছে। আছে অস্বস্তি ও বিড়ম্বনা। বিশেষ করে যাঁদের একই পরিবারে একাধিক শিক্ষক আছেন। আমরা এই বিড়ম্বনা সহ্য করেছি আজীবন। আমার পরিবারে চারজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (এখন তিনজন। আব্বা অবসর নিয়েছেন), তাই আমাদের বিড়ম্বনাটা আরও বেশি। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হয়েছি আব্বা কলা অনুষদের ডিন থাকাকালীন। সব শিক্ষকের আত্মীয় পরিজন, বন্ধু, পরিচিতদের মতো আমার আত্মীয়রাও মনে করেন, আমরা চাইলেই যে কাউকে ভর্তি করিয়ে দিতে পারি। একই পরিবারে এতোজন শিক্ষক হয়েও ধরাধরি করে, প্রশ্ন বলে দিয়ে বা ঘুষ দিয়ে দু’চারজন ছাত্র ভর্তি করাতে পারবো না, এটা হতে পারে না। কোনোভাবেই না পারলে শিক্ষকদের কোটায় তো করাতেই পারি। আমার অবস্থা আরও শোচনীয় হয় যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে শাশুড়ির ফোন আসে, ‘বউমা, অমুককে পাঠালাম। আমার খুব ঘনিষ্ঠ। দেখো চেষ্টা করে। কোনোভাবে ভর্তি করাতে পারো কিনা। বেয়ায়কে বলো।’ খুবই বিব্রতকর অবস্থা! বিশেষ করে ভর্তিচ্ছুরা যদি নিকট আত্মীয় বা খুব কাছের কেউ হন, তখন নানা দিক থেকে হুকুম আসে, ‘কীভাবে করবা জানি না। তবে ভর্তি হওয়া চাই।’ তাঁরা আসেন একবুক আশা নিয়ে। যখন তাঁদের সে আশা পূর্ণ হয় না, তাঁরা মন খারাপ করেন। কারও কারও সঙ্গে আত্মীয়তা নষ্ট হয়। এটা খুব কষ্টের, দুঃখের! আমাদের এরকম দুঃখ অনেকবার পেতে হয়েছে।
তাদেরই বা দোষ কী? বাংলাদেশে ঘুষ দিয়ে, ধরাধরি করে, প্রভাব খাটিয়ে করা যায় না, এমন কাজ নেই। সেখানে ভর্তি কোন্ ছাড়! তাদের বোঝানোই যায় না যে আমরা চাইলেও কিছু করতে পারি না। তারা বিশ্বাস করেন না কারণ বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁসের খবর তাদের জানা। কলেজে তো ছাত্রনেতারাও ভর্তি করাতে পারে! শিক্ষকরা চাইলেও প্রশ্ন বলে দিয়ে কোনো নিকটজনকে ভর্তি করাতে পারেন না। তার কারণ: [১] বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সাধারণত পরীক্ষার আগের রাতে প্রণয়ন, নিরীক্ষণ ও মুদ্রণ করা হয়। প্রশ্ন ছাপার কাজ শেষ হতে রাত পেরিয়ে যায়। যেখানে শিক্ষক ছাড়া আর কারও প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। এমনকি প্রশ্নগুলো প্যাকেটে ভরে পরীক্ষার হলগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বেও শিক্ষকরাই থাকেন। তাই প্রশ্ন ফাঁস হলে শিক্ষকদের চাকরি চলে যাবে। তাছাড়া নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকে। সব শিক্ষক যার যার নিজেদের লোককে ভর্তি করালে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ভর্তির সুযোগ পাবে না। অযোগ্য ছেলেমেয়ে সুযোগ পাবে, যোগ্যরা বঞ্চিত হবে। সব অনুষদের ডিনরা পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন মডারেশন, কম্পোজ, প্রিন্ট ও ফটোকপি করার জন্য সারারাত অফিসে থাকেন। প্রশ্ন ছাপার কাজে নিয়োজিত থাকা কর্মচারীদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং পরীক্ষা শুরুর আগ পর্যন্ত তাদের বাড়ি যেতে দেওয়া হয় না। বিভাগগুলোতে পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন ছাপা ও ফটোকপি হওয়ার পর বিভাগের সভাপতি ও কয়েকজন শিক্ষক (যাঁরা প্রশ্ন করেন শুধু তাঁরা। সব শিক্ষক নন), সেগুলো খামে ভরে আলমারীতে রেখে তালা মেরে তালা সীলগালা করেন। পুরো প্রক্রিয়ায় ভীষণ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। সুতরাং পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে, তা আগে থেকে জানার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ নিয়ে পরীক্ষার আগের রাতে কিছু সুযোগসন্ধানী লোক হলগুলোতে, মেসে অভিভাবকদের প্রতারিত করে তাদের কাছে ভুয়া প্রশ্ন বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। আমি গর্ব করে বলতে চাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রশ্ন ফাঁস করেন না।
[২] শিক্ষকদের কোটায় শুধু শিক্ষকদের ছেলেমেয়ে ভর্তি হতে পারে। আর কেউ নয়। [৩] কোনো শিক্ষকের নিকট আত্মীয় পরীক্ষার্থী থাকলে তাঁকে প্রশ্ন করতে দেওয়া হয় না। ফলে পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে, তা তিনি জানতে পারেন না। পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের জন্য শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করার কঠোর আইন আছে। ১৯৫৩ সাল থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন আউট হয়নি। আব্বা ডিন থাকাকালীন রাত দশটায় এক কর্মচারী এসে জানালো, ‘স্যার, বিনোদপুর, কাজলা, ছেলেমেয়েদের হলে আর স্টেশনবাজারে প্রশ্ন বিক্রি হচ্ছে।’ অথচ তখনো প্রশ্ন আব্বার হাতে। তখনো প্রশ্ন কম্পোজই হয়নি। বরাবরের মতো এবারও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহ্য ও গৌরব ধরে রাখতে পেরেছে বলে গর্ব বোধ করছি। যদিও আরও অনেক ক্ষেত্রেই তার ঐতিহ্য ম্লান হয়েছে কিছু জ্ঞানপাপী দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের বদৌলতে। দুঃখটা এখানেই। অশঃবৎ ইধহঁ অষঢ়ড়হধ-র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]