• প্রচ্ছদ » » একমুখী চিন্তা বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের


একমুখী চিন্তা বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের

আমাদের নতুন সময় : 25/11/2021

কাকন রেজা

একটা বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলো বঙ্গদেশের সেক্যুলারদের। যুক্তরাষ্ট্রে বড়দিনের প্যারেডে গাড়ি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা ও আটচল্লিশজনকে আহত করার জন্য দায়ী যে ব্যক্তি তার পরিচয় প্রকাশ করেছে সেখানকার পুলিশ। তাতেই আগুনে পানি পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দায়ী ব্যক্তির নাম ড্যারেল ই-ব্রুক। না, তার নামের আগে-পিছে কোথাও মোহাম্মদ নেই। এমনটা নিশ্চিত করেই পুলিশ বলেছে এর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে নামের আগে-পিছে ‘মোহাম্মদ’ থাকলেই ‘সন্ত্রাস’ নিশ্চিত হয়ে যেতো। এমন নাম আগে-পিছে থাকলে এবং সেই নামধারী ব্যক্তিগত কারণে কাউকে গুঁতো মারলেও তা ‘সন্ত্রাস’ হয়ে যায়। বিপরীতে পাঁচজনকে খুন ও আটচল্লিশজনকে আহত করলেও তা হয় ‘ক্রেজি ড্রাইভারে’র কাজ। এমন কথাই লিখেছেন এক পাঠক দৈনিক মানবজমিনে এই খবরের নিচে কমেন্টের জায়গায়। তার বক্তব্য ছিলো, ‘এরা কেবল ক্রেজি মোটর চালক- সন্ত্রাসী নয়! নামটি আরবিতে হলে তার পরিচয় হতো কেবলই সন্ত্রাসী।’ এই যুক্তির জবাবে আসলে চুপ করে থাকা ছাড়া বলার কিছু নেই।
বঙ্গদেশে যুক্তিহীন এমন কাজের অভাব নেই। পাকিস্তানকে খেলতে ডাকতে দোষ নেই, দোষ হলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার। শুরু হলো জোর করে দেশপ্রেম গেলানোর চেষ্টা। জোর-জবরদস্তিতে আর যাই হোক প্রেম হয় না। সে দেশপ্রেমই হোক বা দেহজ প্রেম হোক। জবরদস্তির নামে যে দেশপ্রেম শেখানো হচ্ছে তা বরং ভুল মেসেজ দিচ্ছে বিশ্বের কাছে। প্রশ্ন উঠছে সকল সফলতা নিয়ে। যা খেলা, তা খেলার মধ্যেই রাখা উচিত ছিলো। খেলার বাইরে এনে পরিস্থিতি এখন লেজেগোবরে। যুক্তিহীনতা বিষয়ে লিখতে গিয়ে লিখেছিলাম মাদ্রাসা শিক্ষার কথা। সে লেখাতেও কারও কারও দুঃখ জেগে উঠেছে। যেমন জেগেছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৃহৎ মাদ্রাসায় পরিণত হচ্ছে’ এমন আলাপে। অথচ আলাপিরা দেখেন না, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রথম হচ্ছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। মাদ্রাসার বিপরীতে প্রচলিত শিক্ষার দৈন্যতারই প্রমাণ দেয় এই ফলাফল। যেমন ঢাকার সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষাতেও প্রথম হয়েছেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। অথচ যাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা হয়ে যাওয়া নিয়ে দুঃখ তারা ব্যর্থ হচ্ছেন প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান বাড়াতে। যার কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে লজ্জাজনক অবস্থান।
জানি, এর বিপরীতে অনেক ‘পণ্ডিত’ একমুখী শিক্ষার কথা বলবেন। এই যে একমুখী শিক্ষা, এই ধারণাটাও যে ভুল তাদের তা কে বোঝাবে। শিক্ষা কখনো একমুখী হয় না, ব্যবস্থা হতে পারে। শিক্ষা আর শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা যাদের নেই, তাদের শিক্ষার দৌড়টাও সে পর্যন্তই এবং সে কারণেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা প্রথম হন। সেদিনও এক বুদ্ধিজীবীকে দেখলাম সামাজিকমাধ্যমে আহাজারি করছেন ‘একমুখী শিক্ষা’ নেই বলে। বলিহারি। বুঝলাম, একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা করা হলো, তাতে কি বাদ দেওয়া যাবে ধর্মীয় শিক্ষা? এসব বিষয়ে পিএইচডি কি বন্ধ করে দেওয়া হবে? তাহলে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ, যার এক শিক্ষক সেদিন বললেন, তার শিক্ষার্থীরা নাকি ঠিকঠাক সংস্কৃত পড়তে বা বলতে পারে না, তাদের পিএইচডি প্রদান বন্ধ হয়ে যাবে। সংস্কৃত ভাষার উৎপত্তিই হয়েছে ধর্মের উদর হতে। মিথোলজি’র উপরও গবেষণা বন্ধ হয়ে যাবে। মিথোলজি মানে তো ধর্মই, নাকি? প্রতিটা মিথোলজিই ধর্মভিত্তিক। গ্রিক মিথোলজির কথাই বলুন কিংবা হিন্দু পুরাণ। প্রতিটা সভ্যতার সঙ্গেও ধর্মের যোগাযোগ অসম্ভব রকম দৃঢ়। এসব কথা ‘একমুখী চিন্তক’দের কে বোঝাবে। তারা মূলত ‘একমুখী শিক্ষা’ জপতে জপতে, ‘একমুখী চিন্তক’ বনে গেছেন। সবকিছুতেই চলছে একমুখী কার্যক্রম। এই একমুখী চিন্তা আর কার্যক্রম দেশকে আজ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যার পরিণতি চিন্তা করলে শিউরে উঠতে হয়। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট


সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]