• প্রচ্ছদ » » বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মায়া লাগছে, তবে কিছু প্রশ্নও আছে!


বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মায়া লাগছে, তবে কিছু প্রশ্নও আছে!

আমাদের নতুন সময় : 02/12/2021

ইমতিয়াজ মাহমুদ

[১] বেগম খালেদা জিয়া এখন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। শুনতে পাচ্ছি যে তাঁর নাকি লিভার সিরোসিস হয়েছে। তাঁর অসুস্থতার বিবরণ নিশ্চয়ই খবরের কাগজগুলোতে লেখা হয়েছে। আমি সেসব খবর বিস্তারিত পড়িনি। এই এক স্বভাব হয়েছে আজকাল, খবরের কাগজে বেশিরভাগ খবরই বিস্তারিত আর পড়া হয় না। লিভার সিরোসিস আমার পরিচিত রোগ। আমার নানার মৃত্যু হয়েছে লিভার সিরোসিসে। নানা যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সেই মুহূর্তটিতে আমি তাঁর হাত ধরে ছিলাম। মানুষের মৃত্যু কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা সেইটাই আমার প্রথম। লিভার সিরোসিস রোগটা ভালো নয়। আমাদের দেশের খুবই জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন জাফর ইকবাল- তাঁর মৃত্যুও হয়েছে লিভার সিরোসিসে। আমার নানার মৃত্যু হয়েছে সে বহু বছর আগে। মৃত্যুর আগে ঢাকা শহরে এই হাসপাতাল থেকে সেই হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে দৌড়িয়েছে আমার বড় ভাই। তখন পিজি হাসপাতালই ছিলো আমাদের সেরা হাসপাতাল। পিজি থেকে তাঁকে জবাব দিয়ে দেওয়ার পর ভাইয়া তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যায়। আমরা জানতাম তিনি আর বেশিদিন আমাদের মাঝে থাকবেন না। তবুও হোমিওপ্যাথি ইত্যাদি চলছিলো। দোয়া কালাম পড়া হচ্ছিলো। সেগুলোও করা হচ্ছিলো কোনো প্রকার প্রত্যাশা না রেখেই।
মানুষকে চেষ্টা চালিয়েই যেতে হয়। আজকাল চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে, বেশিরভাগ রোগব্যাধিরই চিকিৎসা আছে। কঠিন কঠিন সব রোগ ভালো হয়ে যায়। লিভার সিরোসিসেরও চিকিৎসা নিশ্চয়ই অনেক উন্নত হয়েছে। কথাগুলো একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সেটার কারণ আছে। বেগম জিয়ার এই অসুখের কথা শুনে মায়া লাগছে। তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নাকি দুইবারের প্রধানমন্ত্রী সেটা নিয়ে আমি তর্ক করতে পারি। পনেরোই ফেব্রুয়ারি ভোটার ছাড়া ইলেকশনে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন সেটা গোনা হবে কী হবে না সেই আলোচনা করতে পারি। জামায়াতের সঙ্গে তাঁর পারপিচ্যুয়াল আঁতাত নিয়ে কটু কথা বলতে পারি, সিরিয়াস রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে পারি। জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা করেছিলেন। যে জননী এই দেশের জন্যে নিজের পুত্রকে একদম বলে কয়ে কোরবানি করেছেন, সেই জননীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছেন- এই বেয়াদবি আমি জীবনেও ভুলবো না। এই কথাও বলতে চাই না। সত্যি সত্যি ভদ্রমহিলার জন্যে মায়া লাগছে।
[২] কিন্তু টেলিভিশনের খবরে যখন আমানুল্লাহ আমানের তর্জন গর্জন শুনি, ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুনিপুণ বক্তৃতার লয়কারী শুনি, টেলিভিশনে বিএনপিপন্থি উকিলদের অর্থহীন যুক্তিতর্ক ইত্যাদি শুনি, তখন মুখটা বাঁকা তিক্ত হয়ে যায়। আমার তখন একুশে আগস্টের পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলী মনে পড়ে। আমানুল্লাহ আমান, ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খোন্দকার মোশাররফ, গয়েশ্বর রায়, ফজলুল হক মিলন, মির্জা আব্বাস তাঁরা সকলেই একুশে আগস্টের পর পার্লামেন্টে এবং পার্লামেন্টের বাইরে কীসব বক্তৃতা করেছিলেন আপনাদের মনে আছে? আমি মনে করিয়ে দিতে চাই না- সেসব কথা ছিলো অসভ্য বর্বর কথা। আপনারা মানবিকতার কথা বলেন। ভালো কথা। একুশে আগস্টের পর আপনাদের কথায় মানবিকতা ছিলো? ন্যূনতম মানবিকতা। প্রতিবছর পনেরোই আগস্ট আসে, পনেরোই আগস্ট যায়- আপনারা কি মানবিক আচরণ করেন সে কি আমরা দেখি না? কেক কেটে ফুর্তি করেন আপনারা।
একুশের আগস্টের কথা বলছিলাম, শেখ হাসিনা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন। সেই ঘটনা নিয়ে আপনারা পার্লামেন্টে হাসাহাসি করেননি? বেগম জিয়াই তো সম্ভবত বলেছিলেন যে শেখ হাসিনা নিজেই নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়ে নিজেই নিজের ওপর মেরেছিলেন। এগুলো কোনো সভ্য মানুষের আচরণ? একুশে আগস্টে বিএনপি বা বিএনপির নেতাদের সম্পৃক্ততার কথা বাদই দিলাম- এরকম একটা ঘটনার পর ন্যূনতম সভ্য আচরণ করেছিলেন আপনারা? অনেককেই বলতে শুনছি যে মানবিক বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হোক। আমারও ইচ্ছা করে এই কথাটা বলতে, যে না, ভদ্রমহিলা একজন বয়স্ক মানুষ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা। সরকার যেন তাঁর প্রতি একটু মহানুভবতা দেখায়, তাঁকে যেন চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠায়। কিন্তু বলতে ইচ্ছা করে না। কেন করে না? আমার কেবল মনে হয় এই ভদ্রমহিলা নিজে কি কখনো কারও সঙ্গে সৌজন্য …এসব দেখিয়েছেন। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তিনি সকল সংসদ সদস্যকে বেয়াদব বলে ধমক দিয়েছেন। যেদিন আইভি রহমানের মৃত্যু হয় সেদিন যদি বেগম খালেদা জিয়া গিয়ে জিল্লুর রহমানের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করতেন তাতে কি অসুবিধা ছিলো? তাঁর পুত্রের মৃত্যুর পর দেশের প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কি রকম আচরণ করেছিলেন আপনারা সেকথা ভুলে গেলেন?
[৩] জিয়াউর রহমান কতোজন লোককে বিনা বিচারে হত্যা করেছে সে কথা নিয়ে এখনো আলোচনা হয়। সে কথাও আমি তুলছি না। বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র জাতির জনককে নিয়ে লন্ডনে যে ভাষায় বক্তৃতা করে সেগুলো আপনারা শুনেছেন? আপনারা সরকারের কাছে মানবিকতা প্রত্যাশা করেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে মহানুভবতা প্রত্যাশা করেন। বেগম জিয়াকে কোনো বক্তৃতায় শেখ হাসিনার জন্যে ‘তিনি’ সর্বনাম ব্যবহার করতে শুনেছেন? আমি শুনিনি। শেখ হাসিনার জন্যে তাঁর সর্বনাম হচ্ছে ‘সে’। লক্ষ্য করেছেন? বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে কোনোদিন বেগম জিয়াকে কোনো সম্মানসূচক কথা বলতে শুনেছেন? আমি শুনিনি। গণজাগরণ মঞ্চের সময় আমাদের তিনি কী বলে সম্বোধন করেছিলেন সেকথা তো আমি ভুলিনি। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মায়া লাগছে। বয়স্ক মহিলা, আমার মায়ের বয়সীই হবেন। হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছেন। একজন সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী। আমি সর্বান্তকরণে তাঁর সুস্থতা কামনা করি। সরকার যদি তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে চায়, তাতে আমি ক্ষুব্ধ হবো না। কিন্তু সরকার যেন তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠায় সেই দাবি বা অনুরোধ আমি সরকারকে করবো না। আমি তুচ্ছ মানুষ, আমার দাবি বা অনুরোধে কিছু যায় আসে না। কিন্তু এরকম দাবির জন্য আমি মন থেকে কোনো তাড়া অনুভব করি না। তবুও তাঁর সুস্থতা কামনা করি। প্রত্যাশা করি তিনি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]