• প্রচ্ছদ » » মায়ের সামনে বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলো রাজশাহীর ‘সেই’ ছেলেটি


মায়ের সামনে বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলো রাজশাহীর ‘সেই’ ছেলেটি

আমাদের নতুন সময় : 02/12/2021

ভূঁইয়া আশিক রহমান

 

[২] আব্দুল জলিলÑ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, এখন প্রয়াত। তিনি তখন বালুরঘাট মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের ইনচার্জ। বালুরঘাট মানে ভারতেÑ রাজশাহী, নওগাঁর বর্ডারে। মুজিবনগর থেকে তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছেলেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য। কারণ তখন আমি চলচ্চিত্র নায়ক, আমরা গেলেই ছেলেরা খুব উৎসাহিত হতো। আমি তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদপাঠক ও নাটক বিভাগের দায়িত্বে। জলিল সাহেবের আমন্ত্রণে বালুরঘাট গিয়েছিলাম। আব্দুল জলিল একটি ছেলেকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটি দেখে রাখুন, রাতে এর সম্পর্কে বলবো।’ এ প্রতিবেদকের কাছে ৫ বছর আগে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি বর্ণনা করেছিলেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম।
[৩] তিনি বলেন, বালুরঘাট থেকে একটি টিম পাঠানো হয়েছিলো রেকি করতে। রেকি মানেÑ অপারেশন স্পট ও পরিবেশ-পরিস্থিতি যাচাই করে আসা কোনো অপারেশনের আগে। পরিবেশ-পরিস্থিতি কী রকম, কী অবস্থা, সেখানে কেমন করে অপারেশন করা যাবে, এর একটি জরিপ করে আসা। রেকি করতে যাবে ছয়টি ছেলে। যেখানে রেকি করতে যাবে, সেই জায়গাটি ওই ছেলেটির গ্রামের পাশে। একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। ব্রিজটির ওপর দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্ডার পর্যন্ত এসে মানুষের ওপর অত্যাচার করছিলো। মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিলো, পেলে তাদের হত্যা করছিলো। সে কারণেই ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। ওখানে যাওয়ার সময় ওই ছেলেটিকে যেতে দেওয়া হয়নি। কারণ সে স্থানীয় লোক। তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করে ফেলার প্রবল আশঙ্কা আছে। সেজন্য ক্যাম্প থেকে তাকে যেতে দেওয়া হয়নি। তবে অপারেশনে যারা যাচ্ছিলো, ছেলেটি তাদের বলে দিয়েছিলোÑ ‘তোরা যদি রাতের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারিস, তাহলে দিনের বেলায় আমার মায়ের কাছে আশ্রয় নিবি।’
ছেলেটি তার বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানা দিয়েছিলো। যেহেতু রাতের মধ্যে অপারেশন শেষ করতে পারেনি, তাই ভোর হওয়ার আগেই ছেলেটির বাড়িতে তারা যায়। ছেলেটির মাকে ঘুম থেকে ওঠায়, সেখানেই আশ্রয় নেয়। ছেলেটির মা খুব খুশি হয়। ওরা ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা এবং ছেলের সহযোদ্ধাÑ যতোটা সম্ভব আপ্যায়ন করার চেষ্টা করতে লাগলেন। সকালবেলা ওঠে রান্নাবান্না করছিলেন। কারণ ছেলেগুলোকে খাওয়াতে হবে। ছেলেটির বাবা সকালে ওঠে সব জানতে পেরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে খবরটি জানিয়ে দেয়। খবর পেয়ে সেই বাড়িতে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে উঠানে সারিবদ্ধ করে। তারপর ছেলেটির বাবা-মায়ের সামনেই ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে।
[৪] এই খবর যখন ক্যাম্পে আসে, তখন ক্যাম্প থেকে ছেলেটির বাবার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে কে? প্রশ্নটি সামনে আসে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী কে হবেÑ তা যখন নির্বাচন করা হচ্ছিলো, তখন ছেলেটি বললো, ‘আমি যাবো বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে’। তখন সবাই বললোÑ‘তোর বাবা, তুই যাবি, না এটা হয় না। তুই থাক, আমাদের মধ্য থেকে কেউ যাই’। ছেলেটি তখন বললো, ‘না আমিই যাবো। আমি গেলে আমার বাবা-মা কেউ সন্দেহ করবে না। আমিই বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবো’। তারপর ছেলেটি রাতের অন্ধকারে বাড়িতে যায়, ঘুম থেকে ডেকে তুলে বাবা-মাকে। বাবা-মা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন চাদরের ভেতর থেকে স্টেনগান বের করে মায়ের সামনেই বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ছেলেটি!
[৫] স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন সৈয়দ হাসান ইমাম। বলেন, যুদ্ধের অনেকদিন পর যখন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মিটিং করতে রাজশাহীতে যাই, তখন ছেলেটিকে দেখিয়ে সবাই বলেছিলেন, এই ‘সেই’ ছেলে, যে নিজের মায়ের সামনে বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলো। ছেলেটি তখন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছিলো। খুবই হালকা-পাতলা একটি ছেলে, সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ছেলেটির কথা আজও ভুলতে পারিনি আমি। ছেলেটির কথা মনে পড়লে আজও আমি বিস্মিত হইÑ কী ত্যাগ স্বীকার করেছিলো বাঙালি জাতি। আপন-পর বিচার করেনি। যারাই পাকিস্তানের পক্ষে গিয়েছিলো, তারা যতো ঘনিষ্ঠই হোক, যতোই নিকটাত্মীয় হোকÑ তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]