• প্রচ্ছদ » » শতবর্ষের ভালোবাসা, প্রিয় ডাকু বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকু বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!


শতবর্ষের ভালোবাসা, প্রিয় ডাকু বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকু বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!

আমাদের নতুন সময় : 05/12/2021

হেলাল মহিউদ্দীন : ছাত্রত্ব শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আদর করে মাঝে মাঝে ‘ঢাকু বিশ^বিদ্যালয়’ বলতাম। এখনো খুব বলতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উগ্র প্রেমিক আছেন। খুব নাৎসী টাইপ। তাদের ভয়ে বলি না। ‘ঢাকু’ বলার পেছনে একটি ইতিহাস ছিলো। সময়টা ৮৯’র কোনো একসময়। মনোগ্রাফ তৈরির প্রয়োজনে লাইব্রেরি হতে ৬৮-৬৯ সালের কাছাকাছি সময়ের একটি মনোগ্রাফ তুলে নিলাম। কোনো এক টাইপিস্ট প্রায় কালিবিহীন টাইপরাইটারে কম্পোজ করেছেন। প্রথম পৃষ্ঠাতেই উধপপধ টহরাবৎংরঃু লেখাটিতে মূদ্রণ প্রমাদ। উধপপধ’র শেষের ধ’র জায়গায় ঁ হয়ে শব্দটি উধপপঁ হয়ে রয়েছে। সম্ভবত টাইপিস্ট সাহেব ইউনিভার্সিটির ঁ লেখার তাড়াহুড়োয় দুইবার রীড চেপেছেন। [এরশাদ জমানার আগে ঢাকাকে ইংরেজিতে উধপপধ লেখা হতো।]
আমার প্রাণপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হয়ে গেলো ‘ডাকু’ বিশ্ববিদ্যালয়। কৌতুকবোধ হতেই না হয় খানিকটা আদর চড়িয়ে ‘ডাকু’কে ‘ঢাকু’ বানালাম। যাই হোক, ‘ঢাকু’ কেন বললাম, এ কারণে বিদেশ-বিভুঁইয়ে বসেই একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নাৎসী প্রেমিকের কোপানলে পড়েছিলাম। বোঝালাম আদর করে দেলোয়ারকে দেলু, সালামকে সালু ডাকার মতো আদর করে ‘ঢাকু’ বলেছি। নিছকই মজা করা। ‘ঢাকু’কে ছোট করা নয়। তাঁর দৃষ্টিতে ওটা যেন ব্লাস্ফেমি। ধর্মনাশ। বলেছিলাম, ‘ভাই, আপনারা যে কথায় কথায় ঢাবি ঢাবি করেন, তার চাইতে ‘ঢাকু’ই তো বেশি মায়াবি।
আমার ভাবালুতা ও প্রেম নাৎসী প্রেমিকদের চাইতে খানিকটা কম। পেছনে অনেক যৌক্তিক কারণ আছে। ‘ডাকু’ একটি কারণ। মনোগ্রাফটি হাতে নিয়ে প্রথম অনুভূতি ছিলো ছাত্রদের একাংশ দেখছি আগেও ফাঁকিবাজই ছিলো। সব শিক্ষকও দায়িত্ববান ছিলেন না। সেই ছাত্রের নির্দেশক অধ্যাপক সাহেবই প্রমাণ। না হলে প্রথম পৃষ্ঠাতেই ‘ডাকু’ বানানের ভুলটিই ধরতে পারবেন না কেন? ভেতরেও কোনো রসদ পাইনি। ভুলের ছড়াছড়ি আতঙ্কিত হওয়ার মতো। আমার নিজের করা মনোগ্রাফটি আমার নির্দেশক অধ্যাপক সাহেবও একটিবার দেখে দেননি। বরং তিনি এমনই এক ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ সেটি লিখে রাখার সেরা সময়। পরের কিস্তিতেই লিখবো।
মাত্রাছাড়া প্রেম তো দেখানোই যায়। সেটিই সবচাইতে সোজা কাজ। শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা বরং নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ কিছু অভিজ্ঞতা-আলোচনা শুরু করুন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরামতিতে খানিকটা কাজে লাগতে পারে। শতবর্ষের ভালোবাসা, প্রিয় ডাকু বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকু বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে নামেই ডাকি বা না ডাকি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি প্রিয়-অপ্রিয় অনুভূতির কোনো হেরফের হয় না। প্রতিষ্ঠানটি আরও অনেক ভালো করুক, ত্রুটি-ফ্রুটি কাটিয়ে উঠুক, সেটি কি চাই না? চাই। সর্বান্তকরণেই চাই।
[২] ‘পরীক্ষায় প্রথম হয়েও সরকারি চাকরি পাওয়া হলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অপুর।’ খবরটি ২২ নভেম্বরের। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় নজরকাড়া ফলাফল করায় তাঁর খোঁজ পড়ে। তখন বোঝা গেলো তিনি মাসুদ আল মাহাদী (অপু), যিনি ২৭ সেপ্টেম্বরে আত্মহত্যা করে সকল পত্রিকায় খবর হয়েছিলেন। এটিই ছিলো তাঁর জীবনের সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। অপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ফার্স্ট বয় ছিলেন। তুখোড় ছাত্র, অনার্স-মাস্টার্সে সেরা রেজাল্ট। স্পষ্টভাষী, সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে কথা বলায় নির্ভীক। ভিন্নধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন। বেশ কয়েকটি পত্র-পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করে অনুমান করা গেলো তাঁর হতাশার কারণ। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যোগ্যতম হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাক্সিক্ষত স্বপ্নটি তাঁর কখনোই পূর্ণ হবে না। তিনি দুয়েকজন শিক্ষকের অন্যায্য কোপদৃষ্টির শিকার ছিলেন। যে অন্যায্য প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ হয়, তাতেও তিনি আনফিট। তাঁর মৃত্যসংবাদ এবং প্রায় দুই মাস পর চাকরিপ্রার্থিতায় সাফল্যের খবর উভয়টিই আমাকে অস্বাভাবিক বিষণ্ন করে তুলেছিলো। শিক্ষক দ্বারা আমার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার কষ্টকর স্মৃতিটি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। ঘটনা ১৯৮৯ সালের। কিন্তু সেদিনের পর হতে কখনোই সেই দুঃসহ স্মৃতিটি দূরে সরিয়ে রাখতে পারিনি।
অনার্সে রিসার্চ মনোগ্রাফ তৈরি করতে হতো। ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশই নীলক্ষেত বা এর-ওর কাছ হতে কিছু যোগাড়যন্ত্র করে সামান্য এদিক-সেদিক করে নতুন কভার পেজ লাগিয়ে জমা দিয়ে দিতো। এই অনৈতিক পদ্ধতিটিকে ঘৃণা করতাম। সে কারণে হাতেগোনা দু’চারজন সত্যি সত্যি গবেষণাকারীর অন্যতম ছিলাম। বিষয় ছিলো ‘বাংলাদেশের তিন দশকের চলচ্চিত্রে সমাজচিত্র (১৯৬০-১৯৮৯)। সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রগামী কাজ। টানা চার-পাঁচ মাস গভীর অভিনিবেশে ও একাগ্রতায় চমৎকার একটি মনোগ্রাফ তৈরি করি। নির্দেশনার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মোটেই সময় দিলেন না। তারপর এলো মনোগ্রাফের ভাইভার দিন। ২৫টি মহামূল্যবান মার্কস। তিনজন শিক্ষক বসেছেন। যিনি বিষয়টি পড়াতেন [ভাইভা বোর্ডের প্রধান] হঠাৎ একটি লাল কলম নিয়ে দ্রুত শরীরি শক্তিতে মনোগ্রাফের প্রতিটি পাতায় ক্রস দিতে শুরু করলেন। যেন পাতাগুলো কলমের নিবের খোঁচায় কেটে টুকরো করবেন। চোখ তাঁর প্রায় বিস্ফারিত। প্রশ্নের বালাই নেই। প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘এইটা তুমি চুরি করেছো। এটা তোমার লেখা নয়। তোমার চেহারা দেইখাই কইয়া দেওন যায় তোমার মতো পোলার পক্ষে এই রকম লেখা সম্ভব নয়!’ মনে হয়েছিলো পায়ের নিচের মাটিসহ আমার চারপাশের দেয়ালগুলো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে। তিনি আমার মনোজগৎ ধসিয়ে দিয়েছিলেন। আমার সততাপূর্ণ ঋজু সত্তাটিকে সজোরে ঘাড় চেপে বসিয়ে দিয়েছিলেন চিরতরে। পাশে যে দু’জন শিক্ষক বসা ছিলেন, তাঁরাও বুলিংয়ের প্রতিবাদ দূরে থাকুক, আমাকে খানিকটা আশ^স্ত করে পরিস্থিতি অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টাও করেননি। কোনো এক অব্যাখ্যেয় কারণে তাঁদের একজনের প্রতিও আমার ক্ষোভ, রাগ, ঘৃণা কিছুই তৈরি হয়নি। শ্রদ্ধাবোধও না। আসলে কিছুই না। সেই নরক-কক্ষটি ছেড়ে বেরিয়ে এসে চা খেতে চলে গিয়েছিলাম ছাপড়ায়। পালকের মতো হালকা বোধ করছিলাম। অনুভূতিশূন্য। একেবারেই বোধশক্তিহীন। এখনো প্রায়ই বিস্ময় নিয়ে ভাবী তাঁদের কি এলিয়েন ভেবেছিলাম? অপুর খবর পাঠের পর আমি খুব সহজে সংযোগ তৈরি করতে পারছিলাম নিজের তখকার মানসিক অবস্থার সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে প্রার্থনা- শিক্ষকদের দ্বারা কোনো ছাত্র কখনোই বুলিংয়ের শিকার না হোক। ছোট-বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের অসম্মানের ঘটনা কখনোই না ঘটুক। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]