• প্রচ্ছদ » » এই বাংলায় বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা : নতুন রাষ্ট্র, নতুন উদ্দীপনা


এই বাংলায় বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা : নতুন রাষ্ট্র, নতুন উদ্দীপনা

আমাদের নতুন সময় : 10/01/2022

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তার ঘোষিত স্বাধীনতার দেশে। গোটা বাংলাদেশ তাঁর অধীর অপেক্ষায় ছিলো। একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, মানুষকে এই স্বাধীনতা অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কোটি কোটি মানুষ পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ শুরু করে। সেই প্রতিরোধই রূপান্তরিত হয় জনগণের সশস্ত্র মুক্তিযুুদ্ধে। গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি বৈধ সরকার। এই সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং সব ধরনের সহযোগিতার আয়োজন করে। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অনেক দেশ, গণতান্ত্রিক বিশে^র জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়ায়। রক্তাক্ত সেই যুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য জনগণ অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয়, পাকিস্তানি বাহিনী শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
১৬ ডিসেম্বর সূচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, স্বাধীন বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ এই ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে তখনো বন্দী ছিলেন। সে কারণে আমাদের বিজয় তখনো আমাদের কাছে পূর্ণতা লাভ করেনি। সারাবিশে^ গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ পাকিস্তানকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দিতে চাপ দিয়ে আসছিলো। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী চেষ্টা করেছিলো তাঁকে হত্যা করতে। কিন্তু বিজয় লাভের পর তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
২০ ডিসেম্বর সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করলে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করেন। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দফারফা করার উদ্যোগ নেন। ২২ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করে ইসলামাবাদে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখেন। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করে একটি কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দেন। বঙ্গবন্ধু তাতে সায় দেননি। তিনি তাঁর দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ততোদিনে বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এই খবর আন্তর্জাতিক মহলে জানাজানি হয়ে গেছে। সে কারণে তাঁর অবিলম্বে মুক্তির দাবি তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশেই শুধু নয়, সারাবিশে^ উচ্চারিত হতে থাকে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারও তাঁকে মুক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। ভুট্টো যখন বুঝতে পেরেছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে কোনো কথা বের করা যাবে না, তাঁর মুক্তিও ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তখন তিনি ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে ড. কামাল হোসেনসহ লন্ডনের উদ্দেশ্যে তুলে দেন। তখনই সারাবিশে^ জানাজানি হয়ে গেলো স্বাধীন বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্ত হয়ে লন্ডন যাচ্ছেন। এই খবর সারা বাংলাদেশে এক আনন্দের ঢেউ বইয়ে দিলো। কোটি কোটি মানুষ জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তারা অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকলো কখন প্রিয় নেতা বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করবেন।
বঙ্গবন্ধু লন্ডনে পৌঁছা মাত্রই বিশ^ গণমাধ্যম তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে থাকলো। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু ব্রিটেনের বিশেষ বিমানে প্রথমে দিল্লি বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সেখানে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিপুল অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন। বিমানবন্দরে সমবেত জনতার উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। এরপর তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে দিল্লি ত্যাগ করেন। তিনি ঢাকা বিমানবন্দর বেলা ১টা ৪১ মিনিটে স্পর্শ করেন। লাখ লাখ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। রাস্তার দুই পাশে মানুষ বিপুল করতালি আর হর্ষধ্বনিতে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে থাকে। রেসকোর্স ময়দানে তখন তিল ধারণের ঠাঁই ছিলো না। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক নির্মিত মঞ্চে তিনি জনতার মহাসমুদ্রে দাঁড়িয়ে আবেগঘন এক বক্তৃতা দিলেন। এতে তিনি উচ্চারণ করলেন তার স্বপ্ন সার্থক হওয়ার কথা। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এতেই তিনি তাঁর জীবনের সার্থকতা দেখতে পেয়েছেন বলে সবাইকে জানান। তাঁর এ ভাষণে তিনি কেমন বাংলাদেশ গড়তে চান সে কথাও দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেন।
বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের জন্যই মুখ্য ছিলো না, নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এবং সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্যও অপরিহার্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে তার উপস্থিতির কোনো বিকল্প ছিলো না। ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চলার কারণে সব কিছু ছিলো লণ্ডভণ্ড। নেতৃত্বের মধ্যে ছিলো ঘাপটি মেরে থাকা মোশতাক গং এবং ষড়যন্ত্রকারী নানান মহল। মুক্তিযুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর নামে। তাঁর বিকল্প কেউ ছিলেন না। যারা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর নামে এবং আদর্শে পরিচালিত হয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা, প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা এবং সাহসের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে সফল করতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তাঁরা সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন সবারই ঊর্ধ্বে। তাই তাঁর আসা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মানুষের কাছে অপূর্ণ ছিলো। সেটি পূর্ণতা লাভ করেছিলো ১০ জানুয়ারি তাঁর ফিরে আসার মাধ্যমে। তিনি ফিরে এসেছিলেন বলেই অশান্ত মানুষ শান্ত হলেন, অবাধ্যরাও বাধ্য হলেন। মুক্তিযুদ্ধের অস্থির জাতিগত চিত্ত স্থির হওয়ার শক্তি ও নির্দেশনা খুঁজে পেলো। তাঁর নির্দেশেই তখন মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করতে থাকে। মানুষ যার যার কাজে ফিরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসতে পারলে বিজয়োত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নানান ষড়যন্ত্র এবং দেশীয় বিভিন্ন অপশক্তির অবিমৃষ্যকারিতায় অঙ্কুরেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছে বলেই সেটি ঘটেনি। আমরা রক্ষা পেলাম আমাদের স্বাধীনতাও সুরক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেলো। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা এবং আমাদেরও নতুন রাষ্ট্র নিয়ে এগিয়ে চলার এক নতুন উদ্দীপনা লাভের সুযোগ পাওয়া। পরিচিতি : শিক্ষাবিদ। অনুলিখন : আবু হানিফ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]