• প্রচ্ছদ » » এক ফিনিক্স পাখির নিজ ভূমিতে ফিরে আসা


এক ফিনিক্স পাখির নিজ ভূমিতে ফিরে আসা

আমাদের নতুন সময় : 10/01/2022

অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসলে এদেশের কী হতো বা কেমন হতো এই বাংলাদেশ? আমরা জানি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে জাতির জনক উপস্থিত ছিলেন না। তাঁকে বন্দী করে পাকিস্তানের এক কারাগারে রাখা হয়েছিলো। মাঠে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দীন আহমেদের মতো নেতারা। তাঁরা তাঁর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারাতেই দেশ স্বাধীন হয় নয় মাস সময়কালে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুই ছিলেন আশা ভরসা আর ঐক্যের প্রতীক। ১০ জানুয়ারি যদি না ফিরতেন ভাবা যায় মোশতাক গংরা কি করতো? যারা আমাদের এতোবড় নেতাকে সাড়ে তিন বছরের মাথায় খুন করতে পারে পরিবার-পরিজনসহ নির্মমভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে পারে তারা কি দেশটাকে শান্তি দিতো? বরং এটা মনে করাই স্বাভাবিক বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসলে তারা পাকিস্তানের সেবাদাস কিংবা কনফেডারেশান জাতীয় কিছু করে আমাদের বারোটা বাজাতো।
বাংলাদেশের বিজয়লগ্নে অনুপস্থিত বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার দিনটিও একধরনের বিজয় দিবস। বর্বর পাকিদের চোখ আর তাদের কঠোর শাস্তি এড়িয়ে নেতা ফিরেছিলেন রাজকীয় রূপে। তখন এই রাষ্ট্র টিকবে কিনা এ নিয়ে কতো সন্দেহ। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ইমেজ তখন ভারতের চাইতে ভালো। তাদের মিত্র দেশ আমেরিকা আর চীন। এই তিন শক্তি প্রাণপণ চেয়েছিলো আমাদের জয় ঠেকাতে। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইন্দিরা গান্ধী না থাকলে জয় ছিলো আকাশ কুসুম কল্পনা। অথচ এই নাম না জানা রাষ্ট্রের জনক যখন লন্ডন এসে পৌঁছালেন এবং তারপর যে সংবর্ধনা আর আতিথ্য পেলেন সেটা বিস্ময়কর। অনেকে হয়তো জানেন না বঙ্গবন্ধুকে তিনটি দেশে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। ভারত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ অথবা ইংল্যান্ড। দূরদর্শী মনের নেতা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি। পরে জানা গেলো মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ বা ভারত দু’দেশের একটিতে গেলেই তাঁকে বলয়ভুক্ত করার ব্যাপার এসে যাবে। তাই তিনি গণতন্ত্রের তীর্থভূমি ইংল্যান্ডকে বেছে নিয়েছিলেন ।
পাকিস্তান থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি ভোর রাতে ইংরেজি হিসেবে ৮ জানুয়ারি। এদিন বঙ্গবন্ধু ও ড. কামাল হোসেনকে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৬টায় তাঁরা পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে। বেলা ১০টার পর থেকে বঙ্গবন্ধু কথা বলেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দিন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের সঙ্গে। পরে ব্রিটেনের বিমানবাহিনীর একটি বিমানে করে পরের দিন ৯ জানুয়ারি দেশের পথে যাত্রা করেন। ১০ তারিখ সকালেই তিনি নামেন দিল্লিতে। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র মন্ত্রিসভা, প্রধান নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সেদেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু ভারতের নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের কাছে তাদের অকৃপণ সাহায্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা হিসেবে।’
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে আমরা শরণার্থী জীবন কাটিয়ে আগরতলা হয়ে ফিরছিলাম। একজন অদৃশ্য মানুষের দেশে ফেরার আবেগ তখন ত্রিপুরাকে কাঁদিয়ে কাটিয়ে একাকার করে তুলেছিলো। ফেরার পর তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরেও পেয়েছিলেন অভূতপূর্ব সংবর্ধনা। অতঃপর বিশাল এক জনসভায় জনতার অনুরোধে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বলেছিলেন, ভারত ও সে দেশের মানুষের সহযোগিতার কথা চিরদিন মনে রাখবে বাংলাদেশ। তবে সবচাইতে আবেগময় ভাষণ ছিলো ঢাকায় নামার পর। সে ভাষণে স্বভাবসুলভ কবিতা শুনিয়ে তিনি কবিগুরুকে বলেছিলেন : কবিগুরু দেখে যাও আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।
কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা তিনটি প্রশ্ন করতেই পারি? গণতন্ত্র কি বঙ্গবন্ধুর দল দিতে পারছে? [দুই] মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী দেশ বা জনগণকে কি মনে রেখেছি আমরা? আর সবশেষে যে বাঙালির জন্য তাঁর এতো গর্ব ছিলো সে বাঙালি নামের কিছু কাপুরুষ কি তার মর্যাদা রেখেছে? যারা তাঁর বুক রক্তাক্ত করে দিতে পেরেছে তারা কি আসলেই মানুষ? ইতিহাস কখনো কাউকে ছাড় দেয় না । মিথ্যাও বলে না । তাই ১০ জানুয়ারি আমাদের দেশের সেইদিন হিসেবেই থাকবে যেদিন বাংলাদেশের মানুষ মনে করেছিলো তাদের দেশ এবার টিকবেই কারণ নেতা এসে গেছে। আর সে নেতার দেহাবসান হলেও আদর্শ বা স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেনি। একটা অদ্ভুত ঘটনা এই সে দিনটিতে আমি জন্মেছিলাম। তাই ১০ জানুয়ারি উভয় কারণে আমার মনে চিরকাল উজ্জ্বল। বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার দিনটি মূলত আত্মবিশ্লেষণের দিন। আবেগ উচ্ছ্বাস বা আনন্দের চাইতে পরবর্তী সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি বিশ্লষণ করলেই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। লেখক : কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]