• প্রচ্ছদ » » বঙ্গবন্ধুর জীবনে একমাত্র আনন্দের দিন ১০ জানুয়ারি


বঙ্গবন্ধুর জীবনে একমাত্র আনন্দের দিন ১০ জানুয়ারি

আমাদের নতুন সময় : 10/01/2022

প্রবীর বিকাশ সরকার

বিশ^নন্দিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস নেতা, স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত এবং আজাদ হিন্দ্ ফৌজের প্রধান সেনাপতি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে একদা শেখ মুজিবুর রহমান যৌবনে তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের আদর্শ মনে করেছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে নেতাজির মতো শেখ মুজিবুর রহমানও দেশের বাইরে গিয়ে লড়াই করে বাঙালিকে পাকিস্তানের শাসন-শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনা তার প্রমাণ। ১৯৬২ সালে তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরুর সহযোগিতা চেয়েছিলেন, যেমনটি চেয়েছিলেন নেতাজি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব সময়ে ১৯৪৩ সালে তৎকালীন এশিয়ার স্বাধীন সাম্রাজ্য জাপানের।
কিন্তু জোট নিরপেক্ষ যুদ্ধবিরোধী শান্তিবাদী নেহরু তাতে সাড়া দেননি। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাননি। সুতরাং বিফল হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন। পাকিস্তান সরকার বাদী হয়ে শেখ মুজিবসহ তাঁর অনুসারী ৩৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে পাকিস্তানকে ভাগ করার ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে মামলা দায়ের করে ১৯৬৮ সালে। তাঁকে ফাঁসিয়ে দিতে অনেক চেষ্টা করেও সামরিক সরকার সফল হতে পারেনি। লন্ডন প্রবাসী নীরদচন্দ্র চৌধুরীর সহযোগিতায় ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় অভিজ্ঞ আইনজীবী থমাস উইলিয়ামস আদালতে লড়ছেন শেখ মুজিবের পক্ষে, আর বাইরে কারাবন্দী শেখ মুজিবকে মুক্ত করার জন্য জনতা মারমুখী আন্দোলনে উত্থাল সমুদ্র। মামলায় জয়ী হয়েছিলেন রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমান। তখন পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকার প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান তথা পাকিস্তানের সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টের পেয়েছিলো এই বাঙালি যেনতেন বাঙালি নয়। একেবারে খাঁটি এবং প্রভূত শক্তিশালী বঙ্গসিংহ। একে সহজে দাবিয়ে রাখা যাবে না। কারণ তাঁর পেছনে রয়েছে আরও বাঘা বাঘা বুদ্ধিদীপ্ত বাঙালি। কিন্তু প্রধান মাথা হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে ফিরে এসে শেখ মুজিব হয়েছিলেন বাঙালি জাতির বন্ধু ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি গ্রহণ করে। সেটা ছিলো আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম প্রত্যাবর্তন। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক এই ঘটনার কথা বিস্মৃত হয়নি।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ফিরে আসেননি। কিন্তু তাঁরই একদা অনুসারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে এসেছিলেন। ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সাল তাঁর দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তন। এই দিনটিকে আমরা গুরুত্বের কারণে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ হিসেবে জাতীয়ভাবে উদযাপন করে থাকি, যা এক বিরল ঘটনা বাঙালি জাতির জীবনে। মহান মুক্তিযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত পাকিস্তান সরকার প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো প্রায় ৯৩ হাজার সামরিক ও বেসামরিক যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে। যুদ্ধবন্দী না থাকলে পাকিস্তানকে দু’খণ্ডে ভাগ করার গুরুতর অপরাধে অপরাধী শেখ মুজিবকে আদালতে উপস্থিত করে একতরফা বিচারের মাধ্যমে শাস্তিস্বরূপ ফাঁসি দিয়ে দিতো, তাতে কোনো সন্দেহ ছিলো না। শেখ মুজিবকে হত্যা করাই ছিলো তাদের একমাত্র প্রধান লক্ষ্য, পরবর্তী সময়ে তারা সেটা করতে সফলও হয়েছিলো।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর কূটনীতির কারণে দ্বিতীয়বার শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে গেলেন। তিনি তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় জনতার যে ঢল সৃষ্টি হয়েছিলো সমকালীন ইতিহাসে তার নজির নেই বললেই চলে! আপামর মানুষের আনন্দ, উল্লাস, উত্তেজানা বোমার মতো ফেটে পড়েছিলো তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে, যাঁর কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিলো, লাগাতার পরাধীন বাঙালি জাতি মুক্তি পেয়েছিলো, নিজের দেশের মালিকত্ব ফিরে পেয়েছিলো। অনুরূপ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যদি স্বাধীন স্বদেশ ভারতে ফিরে আসতেন ঠিক এমনই জনসমুদ্রের উল্লসিত বন্যা দেখা যেতো। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সৌভাগ্যবান যে, তিনি সেই বিরলতম ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। আর এই ১০ জানুয়ারি দিনটিই ছিলো তাঁর সমগ্র জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় একটি দিন, কেননা সেদিন তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় বাঙালির কাছে ফিরে আসতে পেরেছিলেন পাকিস্তানের দুর্গম কারাগার থেকে। বলাই বাহুল্য, এর পর তাঁর জীবনে আর আনন্দময় দিন দ্বিতীয়টি ছিলো না। লেখক : রবীন্দ্রগবেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]