• প্রচ্ছদ » » বাংলার বন্ধু, বঙ্গবন্ধু ফিরে আসতেন যদি


বাংলার বন্ধু, বঙ্গবন্ধু ফিরে আসতেন যদি

আমাদের নতুন সময় : 10/01/2022

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

ক’দিন আগেই বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে দারুণ সাজে সেজেছিলো বাংলাদেশ। ওমিক্রনের চোখ রাঙানি তখনো ততোটা বাড়াবাড়ি রকমে পৌঁছেনি। কাজেই কোভিডের সতর্কতাগুলো মেনে জমপেশ উদযাপন হয়েছে এবারে বিজয়ের যা প্রত্যাশার চেয়ে কম হলেও চলমান প্যান্ডেমিকের প্রেক্ষাপটে যথেষ্টই মানতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় সেজেছিলো হাতিরঝিলও। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সেখানে আয়োজন করা হয়েছিলো ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনার। একের পর এক সন্ধ্যায় সেখানে তুলে আনা হয়েছে সারাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই সাংস্কৃতিক মহাযজ্ঞের উদ্বোধনের দিন উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেতো…’ গানটিতে ভার্চুয়ালী গলা মেলালেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। আমার চেম্বারে একটা টিভিতে সারাটাক্ষণ চলতে থাকে কোনো না কোনো নিউজ চ্যানেল। রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে উঁকি দিয়ে টিভি দেখে নিজেকে একটু আপডেটেড রাখার এই চেষ্টাটা করোনাকালে আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে গাইতে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম সত্যি সত্যিই যদি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসতেন!
আজ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুবর্ণজয়ন্ত্রী। বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি লন্ডন তারপর নয়া দিল্লি হয়ে ঢাকায় পৌঁছেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিলো বাঙালি আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার অপূরণীয় ক্ষতি বাঙালি কোনোদিনও পূরণ করতে পারবে না। সত্যি বলতে কী বাঙালি কখনো জানবেই না আমরা কী পেতে পারতাম আর কী হারিয়েছি। আজ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশনের যে গৌরবে গর্বিত পুরো জাতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ক’দিন আগেই তাঁর এক বক্তব্যে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু না হলে বাংলাদেশের এই গ্র্যাজুয়েশন হতো ১৯৮৫তেই। আমরা আশায় বুক বাঁধছি আগামী বছর সচল হবে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের প্রথম ইউনিটটি, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ৪৬ বছর পর। অথচ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন তাঁর সাড়ে তিন বছরের ক্ষণস্থায়ী শাসনকালেই।
যদি এমন হতো, আজ আবারও দেশে ফিরছেন বঙ্গবন্ধু। চারদিকে সাজ সাজ রব, ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি লাখো জনতার মিছিলে মিছিলে সয়লাব। ঠিক যেন বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারির আবহ চারদিকে। বঙ্গবন্ধু আজ দেশে ফিরছেন নয় মাস নয়, দীর্ঘ্য ৪৫টি বছর পর। বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ তাই আকাশ ছোঁয়া। তাঁর অবর্তমানে পাকিস্তানি ধারার শাসকদের ক্ষপ্পরে পড়ে বাংলাদেশের যে ক্রমাগত পেছনে ছুটে চলা তার লাগামটি চূড়ান্তভাবে টেনে ধরেছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আজ থেকে তেরটি বছর আগে ২০০৯ দ্বিতীয় মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর। এর আগে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদটির যবনিকাও এসেছিলো স্বল্প সময়েই, অনেকটাই তাঁর পিতার ক্ষণস্থায়ী শাসনকালের মতোই। কিন্তু থমকে যাননি শেখ হাসিনা। ঠিকই দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এবং সঙ্গে নানানমুখী চক্রান্তকে পরাজিত করে ক্ষমতায় ফিরেছেন ‘বাপকা বেটি’।
সেই থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের এর পরের তেরটি বছরের গল্প শুধু ‘শেখ হাসিনা ম্যাজিকে’ বদলে যাওয়ারই উপাখ্যান। তাঁর নেতৃত্বে একের পর এক ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যাচ্ছেন জাতির পিতার কন্যা। এমডিজি অর্জনে তাঁর নেতৃত্বে দেশ যেমন চূড়ান্ত সফল, এসডিজি অর্জনেও ঠিক একইভাবে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বাস্তবায়ন করা হচ্ছে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প। এ বছরই পর্দা উঠবে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু ট্যানেল আর মেট্রোরেলের মতো তিন তিনটি মেগা প্রকল্পের। মহাকাশে ঘুরছে এখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তখন সাগরের তলদেশ দিয়ে জলরাশি চিড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের সাবমেরিন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের ফিরিস্তি লিখে-বলে শেষ করা দুষ্কর। এ নিয়ে কবিতা লিখতে বসলেও লিখতে হবে মহাকাব্য। দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েই ক্ষ্যান্ত দেননি প্রধানমন্ত্রী। ডেল্টা প্ল্যান প্রণয়ন করে চূড়ান্ত করেছেন বাংলাদেশের আগামী একশ বছরের উন্নয়নের রোডম্যাপটিও।
এই করোনাকালেও তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী নজরকাড়া। শুধু যে কোভিডের সংক্রমণ আর মুত্যৃকেই সহনশীল পর্যায়ে রেখেছে বাংলাদেশ তাই নয়, দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে জীবনযুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন প্রায় দু’লাখ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ। এর মাঝেই কমপক্ষে একটি ডোজ টিকা পেয়ে গেছেন দেশের প্রায় বারো কোটি নাগরিক আর সরকারের গুদামে মজুদ এখনো আরও প্রায় নয় কোটি ডোজ টিকা। দেশের নিজস্ব উদ্ভাবিত এবং উৎপাদিত কোভিড টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্সের’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও শুরু হওয়ার পথে। এই ভ্যাকসিনটি বাজারে আসলে নিজস্ব ভ্যাকসিন রোল আউটের কৃতিত্বের অধিকারী নবম দেশ হিসেবে বিশ্বে নাম লেখাবে বাংলাদেশ আর আমাদের বঙ্গভ্যাক্স হবে ফাইজার আর মডার্নার পর পৃথিবীতে তৃতীয় এমআরএন-এ কোভিড ভ্যাকসিন। হয়তো সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের কোনো ড্রিমলাইনার কোভিড প্যান্ডেমিকে পর্যুদস্ত কোনো দেশের রাজধানীতে অবতরণ করবে বাংলাদেশের উপহার বোঝাই বঙ্গভ্যাক্স নিয়ে। ভাবা যায়?
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ, তাঁর ভাষায় ‘দরকষাকষিতে সক্ষম’ একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আজ নিজেদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশকে সুযোগ করে দেয় প্রতিবেশীকে ঋণ বা সামরিক যান উপহার দিয়ে উদীয়মান শক্তি হিসেবে নিজেকে জানান দেওয়ার। তারা আমাদের না আটকে বরং সুযোগ করে দেয়। কারণ আমাদের সখ্যতা এখন সবার বড় প্রয়োজন। সেই কারণেই একটি ভ্যাকসিন পরাশক্তির ভ্যাকসিনের চালান দেশে পৌঁছতে না পৌঁছতেই ঢাকার বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ভ্যাকসিন পরাশক্তির বিমান বোঝাই উপহারের কোভিড ভ্যাকসিন।
বিমানবন্দরে নেমে তাঁর অবর্তমানে তাঁর কন্যার হাত ধরে বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশ দেখে বঙ্গবন্ধুর কেমন অনুভূতি হতো তা আমরা কখনোই জানতে পারবো না। লেখার শুরুতে যে স্বপ্নদৃশ্যের অবতারণা করেছি, খুব ভালো করেই জানি তা শুধুই স্বপ্ন। কখনোই তা বাস্তব হওয়ার নয়। কখনোই আর ফিরে আসবেন না বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় বাংলায়। কখনোই আর সন্ধ্যা মুখার্জির কণ্ঠে শুনবো না, ‘বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তুমি তোমার সোনার বাংলায়…।’ কিন্তু কন্যা সন্তানের পিতা হিসেবে আমি খুব ভালো করে জানি নিজ কন্যার এতোটুকু সাফল্যে আমার মতো প্রতিটি কন্যার পিতার বুক যখন ফুলে-ফেঁপে দশ হাত হয়ে যায়, তখন দশদিকে তাঁর প্রিয় কন্যার হাজার রকমের এতো সব সাফল্য দেখে গর্বিত বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই পরলোকে বসে গর্বিত ভঙ্গিমায়ই এখন তার প্রিয় পাইপে পরের টানটি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লেখক: ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]