• প্রচ্ছদ » » ভুট্টো শেখ মুজিবকে তেহরান অথবা ইস্তাম্বুলে পাঠাতে চেয়েছিলেন


ভুট্টো শেখ মুজিবকে তেহরান অথবা ইস্তাম্বুলে পাঠাতে চেয়েছিলেন

আমাদের নতুন সময় : 10/01/2022

সুভাষ সিংহ রায় : আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালন করে থাকি। গত বছর (৮ নভেম্বর ২০২০) মহান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছিলো। অধিবেশনের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তখনকার রেসকোর্স ময়দান) সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পুরোটা আবার উপস্থাপন করা হয়েছিলো। ১০ জানুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। কেননা সেদিনই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ফিরে পেয়েছিলো। ওইদিন তিনি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আবেগে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে যে স্থানে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের সামনে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- দেশে ফিরে এসেই সে জায়গায় ফিরে এসেছিলেন। নয় মাস নির্জন কারাবাসের যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা, যেকোনো সময়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলার পরিস্থিতি অতিক্রম করে বিশ্ব জনমতের চাপে ৮ জানুয়ারি মুক্তিলাভ করেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে নিজের পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কাছে না গিয়ে সরাসরি জনগণের কাছে ফিরে এসেছিলেন। লাখো মানুষের সামনে তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের স্বাদ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে।’দৈনিক পূর্বদেশ-এর ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারির প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘জাতির জনক ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বহন করেছিলো ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর কমেট জেট বিমানটি। বাংলাদেশ সময় ১টা ৪১ মিনিটে বিমানটি ঢাকা বিমানবন্দরের ভূমি স্পর্শ করে।’
এদিকে সেদিনেরই ওয়াশিংটন পোস্টে বঙ্গবন্ধুর ঢাকায় প্রত্যাবর্তন নিয়ে লেখা হয়েছে, ‘অ্যারাইভড অ্যাট ঢাকা এয়ারপোর্ট অন ১.৪৫ অ্যাবোর্ড আ ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্স কমেট। হি ফ্লিউ ফ্রম নিউ দিল্লি হোয়ার মেট উইথ প্রাইম মিনিস্টার ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড প্রেসিডেন্ট ভি.ভি. গিরি অন হিজ ওয়ে হোম ফ্রম লন্ডন।’ বাংলাদেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে বন্দী রাখায় আরও নিন্দিত হয় পাকিস্তান। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২, পাকিস্তানের নতুন সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো কারাগারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির কথা রেডিও’র সংবাদে শোনার পর বাংলাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ৮ জানুয়ারি সন্ধ্যা থেকে সারারাত মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল-স্টেনগানের ফাঁকা আওয়াজ করে আনন্দ-উল্লাস করেছিলো। রাস্তায় নেমে এসেছিলো লাখ লাখ মানুষ। ৯ জানুয়ারি জানা গিয়েছিলো, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে সরাসরি বাংলাদেশে না এসে তিনি লন্ডনে যাচ্ছেন। ঢাকা বা দিল্লি না গিয়ে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো তাঁর জীবনের দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধু ঢাকা না গিয়ে লন্ডনে গেলেন কেন? এ সম্পর্কে লন্ডনে সাংবাদিক সুন্দর কাবাদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারটির সার-সংক্ষেপ আজকের মানুষের সামনে তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করি না। লন্ডনে কেন- সুন্দর কাবাদির এ প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, বন্দী হিসেবে তাঁর ঢা
কায় যাওয়ার বদলে লন্ডনে না এসে উপায় ছিলো না। তিনি ঢাকাতেই যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভুট্টো তাতে রাজি হননি। তাঁকে ভারতে যেতে দিতেও ভুট্টো নারাজ। ভুট্টো শেখ মুজিবকে তেহরান অথবা ইস্তাম্বুলে পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব ওই দুই জায়গার কোনো জায়গাতেই যেতে রাজি হননি। ভুট্টোকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তেহরান বা ইস্তাম্বুল যাওয়ার বদলে তিনি পাকিস্তানের কারাগারেই থাকবেন এবং এই সিদ্ধান্ত থেকে এতোটুকু নড়বেন না। এরপরই ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠাতে রাজি হলেন। আর এ কারণেই বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে আসা। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনোরকম একটা সম্পর্ক রাখা যায় কিনা? বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, দেশে ফিরে সবার সঙ্গে আলোচনা না করে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারিতে লন্ডনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য আমরা একটু দেখে নিতে পারি। ‘আজ আমি স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এ মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে তখন আমি ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’র দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দী জীবন কাটিয়েছি। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুনানি অর্ধেক সমাপ্ত হওয়ার পর পাক কর্তৃপক্ষ আমার পক্ষ সমর্থনের জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করে। আমি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ‘বিশ্বাসঘাতক’-এর কলঙ্ক নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর, আমার বিচারের জন্যে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিলো তার রায় কখনো প্রকাশ করা হবে না। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠান করে আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ফন্দি এঁটেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে অস্বীকার করেন। জনাব ভুট্টো আমাকে না বলা পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। জেলখানা এলাকায় বিমান আক্রমণের জন্যে নিষ্প্রদীপ জারি করার পর আমি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা জানতে পারি। জেলখানায় আমাকে এক নিঃসঙ্গ ও নিকৃষ্টতম কামরায় বন্দী করে রাখা হয়েছিলো যেখানে আমাকে তারা কোনো রেডিও, কোনো চিঠিপত্র দেয়নি। এমনকি বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে, তা জানতে দেওয়া হয়নি।’ ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সময় দুপুর ৩টায় রেডিও পাকিস্তান ঘোষণা করে যে, শেখ মুজিবের ইচ্ছানুসারে একটি বিশেষ পাক-বিমানে তাঁকে লন্ডনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তিনি লন্ডনের ক্লারিজস হোটেলে অবস্থান করছেন।
ওই সময় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে যথাসম্ভব শীঘ্র লন্ডন থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার আয়োজন করা হচ্ছে।’ ‘আগামীকালের মধ্যে শেখ মুজিবকে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে পৌঁছে দিতেই হবে’ বলে জনাব চৌধুরী উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঢাকা বিমানক্ষেত্রটি এখনো আন্তর্জাতিক বিমান অবতরণের উপযোগী হয়নি। তাই লন্ডন থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে হয়তো মাঝে কোথাও তার বিমান বদল করার প্রয়োজন হবে। আমরা জেনে থাকবো, বঙ্গবন্ধু প্রয়োজনের তুলনায় এক মিনিটও বেশি লন্ডনে থাকেননি। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে আরামে রাখার জন্য যথাসম্ভব ব্যবস্থা করেছিলো। ৪০ বছর আগে গান্ধীজিকে তারা যেভাবে গ্রহণ করেছিলেন, এবার শেখ মুজিবকেও তারা সেভাবে গ্রহণ করেছেন। যদিও ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র একদিন আগেই বলেছিলেন যে, শেখ মুজিব ব্রিটিশ সরকারের অতিথি নন, কিন্তু তবুও ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রতি আতিথেয়তা দেখিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিথ তার ব্যবহারের জন্য রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি বিমান দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, ইয়াহিয়া খানের কাছে তিনি ধরা দিলেন কেন- অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কেন তিনি অজ্ঞাতবাসে গেলেন না- সে প্রশ্নও উঠেছিলো। সংক্ষেপিত। লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]