• প্রচ্ছদ » » স্বদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে নতুন দেশ গড়ার ১৫ দিকনির্র্দেশনা দিয়েছিলেন, দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র, যা ধর্মভিত্তিক হবে না’


স্বদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে নতুন দেশ গড়ার ১৫ দিকনির্র্দেশনা দিয়েছিলেন, দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র, যা ধর্মভিত্তিক হবে না’

আমাদের নতুন সময় : 10/01/2022

ভূঁইয়া আশিক রহমান

[২] এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশে ফিরে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার ব্যাপ্তি ছিলো সতের মিনিট। এই ভাষণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ার দিকনির্দেশা ও পথনকশা ছিলো। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই ভাষণে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারিত্র্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনও তুলে ধরেছিলেন।
[৩] বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারিত্র কেমন হবে, সেই ভাষণে তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে, খেয়েপরে সুখে থাকবেÑএই ছিলো আমার জীবনের সাধনা’। তিনি আরও বলেছিলেন, বাংলার মানুষ, বাংলার বেকাররা যদি কাজ না পায়, পেটভরে খেতে না পায় তাহলে এই স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ তিনি স্বাধীনতাকে বাঙালির মুক্তির পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যে কথাটি ৭ মার্চের ভাষণে তিনি বলেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, স্বাধীনতার একবার, মুক্তির কথা তিনবার উচ্চারণ করেছিলেন। বলেছিলেন।
[৪] একইসঙ্গে তিনি নির্ধারণ করে দিলেন, রাষ্ট্রীয় চারিত্র্য। তিনি বললেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে, যার ভিত্তি কোনো ধর্মীয় ভিত্তি হবে না। বাংলাদেশের ভিত্তি হবে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধান রচনার সময় যুক্ত হয়েছিলো, ‘জাতীয়তাবাদ’। যার ফলে হয়েছিলো রাষ্ট্রীয় চার মূল নীতি। রাষ্ট্রীয় চার মূল নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্র চলে কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানে এখনো আছে ‘রাষ্ট্রধর্ম’। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম লেখা থাকলে রাষ্ট্রের ভিত্তি ধর্ম হয়ে যায়। এটা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
[৫] বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান। অর্থাৎ আমাদের আত্মপরিচয়ের বহুমাত্রিকতাকে সমন্বিত করে নিজের পরিচয় তিনি ধারণ করেছিলেন। আমাদের আত্মপরিচয় দেওয়ার সংকট থাকার যে কথা নয়, তা তিনি বলেছিলেন। আরও বলেছিলেন, মনুষ্যত্ব, বাঙালিত্ব, মুসলমানিত্ব একই সমান্তরালে অবস্থান করেছে। এ ব্যাপারটি আমাদের জন্য শিক্ষণীয় ও দিকনির্দেশক। আবার একইসঙ্গে তিনি বাঙালিকত্বকে তিনি কতোটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তার প্রমাণ তিনি যখন বললেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময়ও আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ। বাংলার মাটি আমার স্থান। বাঙালিকত্বকে তিনি সবচেয়ে উপরে তুলে ধরলেন। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি ছিলেন বাংলার মানুষ ও প্রকৃতির প্রতিকৃতি। একইসঙ্গে ধর্মীয় অবমাননা সম্পর্কেও তিনি সাবধান বাণী উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, ইসলাম ধর্মের অবমাননা হোক আমি চাই না।
[৬] রাষ্ট্র গঠন সংক্রান্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাঙালির কী কী করণীয় দিকনির্দেশনা ছিলো। ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফেরার পর যে ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন, তা নতুন বাংলাদেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার একটি পথনকশা তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন। এখন আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধুর পথনকশা অনুযায়ী বাংলাদেশ চলছে কি? এটা আমাদের বিবেচনা করা দরকার।
[৭] সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার জন্য কাজ হচ্ছে। কিন্তু সোনার বাংলা গড়ার জন্য যা যা করা দরকার, অন্তত আদর্শিক দিক থেকে, সেদিকে সরকারের নজর আছে বলে মনে হয় না। সেজন্য আমাদের নিজেদের দিকে তাকিয়ে আত্মমূল্যায়ন, আত্মসমালোচনা করা দরকার। বঙ্গবন্ধু বলতেন, আত্মসমালোচনা করুন, আত্মসংযম করুন, আত্মশুদ্ধি করুন। আমার মনে হয়, সেই কাজটি আমাদের করা উচিত।
[৮] ষোলো ডিসেম্বর বিজয়ের পরে সংগত কারণেই আমরা আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠেছিলাম। কারণ প্রায় ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দুঃসহ যাতনার সফল সমাপ্তি ঘটেছিলো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণ করেছিলো। সেই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন এবং যাতনাÑ দুটিই মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে ভাবটি তৈরি হয়েছিলো তা এককথায় অবর্ণনীয়। কারণ এই অসময়ে আমাদের যে চেতনা, আমাদের যে মানসিকতা তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়।
[৯] প্রাথমিক এই বিজয় আনন্দ, পরমভাবে কাক্সিক্ষত এবং পরমমূল্যতার প্রাপ্তির পরে যে তাৎক্ষণিক উল্লাস তা কিছুটা মিইয়ে গিয়েছিলো যখন আমরা সচেতন হলাম যে স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্রষ্টা আমাদের মধ্যে নেই। তখন কিন্তু আমরা বেশ সংশয়ের মধ্যে ছিলাম যে তিনি আদৌ মুক্তি পাবেন কিনা, বেঁচে আছেন কিনা। ৮ জানুয়ারি আমরা সর্বপ্রথম বিবিসির খবর থেকে জানলাম যে, বঙ্গবন্ধু মুক্ত এবং খুব শিগগিরই তিনি দেশে ফিরবেন।
[১০] জাতির জনকের বীরের বেশে প্রত্যাবর্তন হয়েছিলো ১০ জানুয়ারি। তাঁর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছিলো। শুধু তাঁর প্রত্যাবর্তনই নয়, রেসকোর্সে যে ভাষণটি সেদিন তিনি দিয়েছিলেন আমার বিবেচনায় তা ছিলো নানান মাত্রিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ওইদিন আমি উপস্থিত থেকে ভাষণটি শুধু শুনিইনি, উপলব্ধি করেছি যে, ওই ভাষণে স্বাধীন দেশটি গড়ার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ছিলো। একই জায়গা ও মঞ্চ থেকে একাত্তরের ৭ মার্চ তিনি আমাদের সংগ্রামের আগামীর সুস্পষ্ট ইঙ্গিতটি দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা কী করে পেতে হবে তার পথনির্দেশ ছিলো। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ঠিক একই মঞ্চ থেকে নতুন দেশটি গড়ার সর্বমোট ১৫টি দিকনির্র্দেশনা দিয়েছিলেন। আমার সৌভাগ্য ৭ মার্চের ভাষণ উপস্থিতি থেকে শুনেছি, প্রত্যক্ষ করেছিলাম ইতিহাসের একটি অধ্যায় কীভাবে নির্মিত হচ্ছে। ১০ জানুয়ারিতেও একইভাবে রেসকোর্সের একটি স্থানে অবস্থান নিয়ে ওইদিনের ভাষণটি শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো।
[১১] ১০ জানুয়ারির ভাষণে যে ১৫ দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন তা যদি সামগ্রিকভাবে মোটা দাগে বলি তাহলে দেখা যাবে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, দেশের পররাষ্ট্রনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে এর সবকিছুই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই ভাষণে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
[১২] মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ মাসেরও বেশি পাকিস্তানে কারাবাস করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে বঙ্গবন্ধু বিস্মৃত এবং বিচ্ছিন্ন ছিলেন। কিন্তু তিনি দেশ, জনগণ থেকে বিস্মৃত বিচ্ছিন্ন ছিলেন না, তার প্রমাণ ১০ জানুয়ারির ভাষণ। ৭ মার্চের ভাষণটি ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক দলিলের স্বীকৃতি দিয়েছে তাতে আমরা উল্লসিত। কিন্তু একইসঙ্গে আমি মনে করি যে, একটি নতুন দেশ গড়ার যে দিকনির্দেশনা সংবলিত ভাষণ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ১০ জানুয়ারির ভাষণটির যে মূল্য তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আমরা প্রত্যাশা করছি।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]