• প্রচ্ছদ » » তরুণদের সুযোগ না দিলে কোনোদিনও এই দেশ এগোবে না


তরুণদের সুযোগ না দিলে কোনোদিনও এই দেশ এগোবে না

আমাদের নতুন সময় : 16/01/2022

আমিনুল ইসলাম

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়েছি গেস্ট লেকচারার হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি আমাকে দেখে প্রথম কথাটি বলেছেন, আমি তো ভেবেছিলাম আপনি বয়স্ক কোনো অধ্যাপক হবেন। আপনি তো পিচ্চি একটা ছেলে। পুরো রুমজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যান্য শিক্ষক ছিলো। এমন অবস্থায় আমার কী করা উচিত, বুঝতে পারছিলাম না। তাছাড়া দীর্ঘ ১৮ বছর বিদেশে থাকার পর দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে উঠতেও পারছি না ভালো করে। শেষমেশ চমৎকার একটা হাসি দিয়েই তাঁর কথার উত্তর দিয়েছি। কিন্তু অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যান্য শিক্ষকরা আমাকে মূল্যই দিচ্ছেন না। তারা ভেবে নিয়েছেন, আমার বয়স কম। আমার সঙ্গে এতো কথা বলার কী আছে। টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে গেলাম, সেখানেও একই কথা। একটা সেমিনারে গেলাম, সেখানেও সবাই বলছে, আরে আপনি তো একটা বাচ্চা ছেলে। এতে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা। কারণ এই মাঝ বয়সে এসে প্রতিদিন অনেক পরিশ্রম করতে হয় স্রেফ নিজের শরীরকে ফিট রাখার জন্য। খাদ্য তালিকা এবং শরীর চর্চার পেছনে আমাকে প্রতিদিন প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ব্যয় করতে হয়। কোথায় মানুষজন আমাকে কম বয়স্ক বলছে, আমি আনন্দিত হবো, উল্টো দেশে এসে আমার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারণ কম বয়স্ক ভেবে তারা কেউ ভালো করে এমনকি আমার কথাও শুনতে চাইছে না। তারা ভাবছে, এ তো কম বয়স্ক একজন মানুষ। তার কথা শুনতে হবে কেন। এর আগেরবার যখন দেশে এসেছিলাম, তখন চ্যানেল আইতে এক টকশোতে সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান তো আমাকে অনুষ্ঠান শুরুর আগে বলে বসেছেন, আরে এ তো বাচ্চা প্রফেসর। পুরো আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছিলেন, দেখে মনে হচ্ছিলো, তোমার সঙ্গে কথা বলার আবার কী আছে। অথচ আমার কিন্তু যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তাছাড়া আমার বয়স হয়েছে কী হয়নি, সেটা কেন দেখতে হবে? কম বয়স্ক তরুণদের কথা কি শোনা যায় না? এটা কোন ধরনের মানসিকতা আমাদের।
অফিস-আদালত থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই এভাবে তরুণদের অবহেলা করা হয়। আপনি চাকরি করছেন, দেখবেন আপনার সিনিয়র কলিগরা আপনার কোনো প্রস্তাব কানেই তুলবে না। বলে বসবে, আগে সিনিয়র হও। তার প্রস্তাবটা কি শোনা যায় না? সেটা যাচাই করা যায় না? ইউরোপের দেশগুলো অনেক এগিয়ে গেছে স্রেফ তাদের তরুণ প্রজন্মকে সামনে আসার সুযোগ করে দিয়ে। ফ্রান্সের মতো প্রভাবশালী দেশে একজন তরুণ দেশের প্রধান হতে পেরেছে। আমার পাশের দেশ ফিনল্যান্ডে তো ৩০ বছরের একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, মানে প্রধান যে ব্যক্তি, তিনি ভিসি হয়েছেন ২৮ বছর বয়সে। কীভাবে হলেন? কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে তিনি তাঁর পরিকল্পনাটি বিশ্ববিদ্যালয়কে জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় সেটি শুনেছে, যাচাই করেছে এবং তাদের মনে হয়েছে- একে দায়িত্ব দেওয়া যায়। এজন্য কেউ তার বয়স দেখতে যায়নি। সে কোন পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়, সেটাও কেউ দেখতে যায়নি। সামার (গ্রীষ্মের) দিনে অনেক সময়ই দেখি হাফপ্যান্ট পরে চলে এসেছে।
আর আমরা আছি কার বয়স কেমন। কে কী ড্রেস পরেছে এটা নিয়ে। ৩০ বছরের ছেলেটা ভুঁড়ি বের করে, কপালে ভাঁজ ফেলে বয়স্ক সাজার চেষ্টা করছে। না হলে তো সমাজে কোনো মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। বাইরের আবরণ দিয়ে আমরা মানুষের কাজ যাচাই করছি। অথচ কাজটা আদৌ ঠিক হচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে আমাদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ না দিলে কোনোদিনও এই দেশ এগোবে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো এখন সুপারসনিক গতিতে এগোচ্ছে। কারণ তাদের নেতৃত্বে আছে তরুণ প্রজন্ম। আর আমরা আছি- ‘আরে আপনার তো বয়স কম। অনেক জুনিয়র। আগে সিনিয়র হন। এরপর আপনার কথা শোনা যাবে।’ এই ভাবনায়।


সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]